একজন খ্রীষ্টান কী অন্য ধর্মের মানুষের সাথে বিবাহ করতে পারে?
ভূমিকা
এই প্রবন্ধে বহু চর্চিত একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো।
একজন খ্রীষ্টান অন্য ধর্মের মানুষের সাথে বিবাহ করতে পারে কি না এবং এ বিষয়ে
খ্রীষ্টমণ্ডলীর ধর্ম শিক্ষা ও পবিত্র বাইবেল কি বলে সেটা আমাদের জানা দরকার।
মানুষের ব্যাক্তিগত পছন্দ ও মতামত ভিন্ন রকমের হতে পারে, তবে সেটা যদি খ্রীষ্টীয় ধর্মশিক্ষার বিরুদ্ধে যায় তাহলে সেটা কোন ভাবেই
গ্রহণীয় নয়।
বিবাহ হলো মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি
অধ্যায়। কথায় আছে, মানুষের দুবার জন্ম হয়। প্রথম, যখন সে পৃথিবীতে আসে। দ্বিতীয়, যখন সে
জানতে পারে, কেন সে এই পৃথিবীতে এসেছে। কিন্তু মানুষ
যখন বিবাহ করে, তখন সে তার জীবনটাকে ও জীবনের
উদ্দেশ্যকে সেই মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেয়। অর্থাৎ, একটা
মানুষের জীবনের মূল উদ্দেশ্য পূরণ হওয়া বা না হওয়াটা নির্ভর করবে তার জীবনসঙ্গী বা
জীবনসঙ্গিনীর উপর। ভুল মানুষের সাথে বিবাহ হয়ে গেলে, পুরো জীবনটাই নষ্ট হয়ে যায়। ঠিক সেই কারণেই বিবাহ করার আগে আমাদের সঠিক
জীবনসঙ্গী নির্বাচন করাটা খুব জরুরী। শুধুমাত্র আবেগের বশে কিংবা হঠকারী সিধান্তে
একজনকে বিয়ে করে ফেলাটা প্রকৃতপক্ষে একটা দুর্বল সিধান্ত। যার জন্য আজ বহু মানুষকে
ভুগতে হচ্ছে।
অনেক মানুষ এ কথা বুঝতে চায়না যে, মিশ্র বিবাহ আমাদের সমাজ ও পরিবারের আভ্যন্তরীণ সম্পর্ক, ঐতিহ্য এবং পরম্পরাগত বৈশিষ্টের জন্য কতটা ক্ষতিকর। মিশ্র বিবাহ হল, যখন একটা নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষ অন্য ধর্মের মানুষের সাথে বিবাহ করে।
বর্তমান সময়ে মানুষের মধ্যে মিশ্র বিবাহ করার প্রবণতা অনেক বেশী বেড়েছে। এরই সাথে
ইন্টারনেট, সামাজিক গণমাধ্যমগুলি এবং তথাকথিত কিছু
স্বাধীনচেতা মুক্তমনা ব্যাক্তি আগুনে ঘি ঢালার কাজ করেছে। আজকাল স্বাধীনতার ধুয়ো
তুলে মানুষ যা ইচ্ছে তাই করে বেড়াচ্ছে, মুখে যা আসে
তাই বলে বেড়াচ্ছে। অথচ কেউ যদি এদের বিকৃত চিন্তাভাবনাকে সংশোধন করতে উচিত কথা
বললেই, তারা সেই মানুষকে 'বিচার' করার দায়ে অপরাধী বলেই গণ্য করছে।
আমাদের বর্তমান যুবসমাজ স্বাধীনতার সঠিক অর্থ বোঝে না। স্বাধীনতার অর্থ, “আমি যা ইচ্ছে বলতে পারি, করতে পারি বা
পড়তে পারি”, তা কিন্তু নয়। বরং, আমার যা করা উচিত, বলা উচিত বা পড়া উচিত; তা প্রয়োগ করবার স্বাধীন ইচ্ছা শক্তিকেই বোঝায়। এ বিষয়ে ফ্রাঞ্জ কাফকার
একটি বিখ্যাত উক্তি মনে পড়ে যায়। তিনি একবার বলেছিলেনঃ “I am free and that
is why I am lost.” ।
প্রতিটি মানুষকে তার আপন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের
সাথেই বিবাহ করা উচিত। এর অনেক সুবিধা আছে। কিন্তু সকলে এ কথা বোঝেনা। লজ্জার বিষয়
হলো, আজকাল খ্রীষ্টানদের একাংশ যুগের হাওয়ায় গা ভাসিয়েছে। তারা বাইবেলের
মৌলিক শিক্ষা বাদ দিয়ে বিধর্মীদের মতো নীতিজ্ঞানহীন জীবনধারাকে ভালো বলে মনে করছে।
তারা মনে করে, তাদের এই আচরণ দিয়ে একটা উৎকৃষ্ট
মানের দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। এভাবে তারা বিধর্মীদের মন জয় করতে চাইছে, ধর্ম নিরপেক্ষতার আড়ালে তারা খ্রীষ্টধর্মকে তুচ্ছ বিষয় বানিয়ে ফেলেছে।
প্রতিটি ধর্মের নিজস্ব মৌলিক শিক্ষা আছে। ধর্মের মূল
ভিত্তিই হলো বিশ্বাস। কিন্তু যা আমি বিশ্বাস করি, তা
যদি আমি বাস্তব জীবনে মেনেই না চলি, তাহলে সেই
বিশ্বাসের কি কোনও মূল্য থাকে? একজন প্রকৃত
খ্রীষ্টান, যে সঠিক ধর্মশিক্ষা পেয়েছে, যার পবিত্র বাইবেলের নিয়মিত চর্চা আছে; সে
একথা ভালো মতো জানে যে, অখ্রীষ্টানদের সাথে বৈবাহিক
সবন্ধ স্থাপন করা খ্রীষ্টধর্ম বিরোধী কাজ। কিন্ত যারা ঐ নামে মাত্র খ্রীষ্টান, তাদের কাছে খ্রীষ্টবিশ্বাস হলো লোক দেখানো ব্যাপার। পবিত্র বাইবেলে
প্রভু ঈশ্বর অনেক জায়গায় বিশ্বাসীদের অন্য ধর্মের মানুষের সাথে বিবাহ করতে কঠোর
ভাবে বারণ করেছেন। এছাড়াও পবিত্র বাইবেলে সেই সমস্ত অমঙ্গলকর ঘটনার কথাও উল্লেখ
করা আছে, যা ঘটেছে অন্য ধর্মের মানুষের সাথে বিবাহ
করার ফলে। এবং পরবর্তী ভয়ংকর পরিণামরুপে কি ভাবে একটা বংশ, একটা সম্প্রদায়, একটা একক রাজ্য এবং পরে
গোটা একটা জাতি ও দেশকে ধ্বংস করে দিয়েছে, তা জানলে
হতাশ হতে হয়। পবিত্র বাইবেলে উল্লেখিত সেই সমস্ত বিষয়গুলি আমি উল্লেখ করবো।
যে সমস্ত খ্রীষ্টান অন্য ধর্মের মানুষের সাথে বিবাহ
ক’রে ফেলেছে বা বিবাহ করতে চায়, তারা এই ব্যাপারে সাফাই
দিতে গিয়ে বলে, “আমি ভালবেসে বিয়ে করেছি”, বা “আমি তাকে ভালবাসি”। তারা এ কথাও বলতে পারে, “কাউকে ভালোবাসা কি অপরাধ” ? না, কাউকে ভালোবাসা কখনই অপরাধ নয়। কিন্তু ঈশ্বরের আজ্ঞা লঙ্ঘন করে সেই
সমস্ত মানুষদের সাথে বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপন করা অবশ্যই অপরাধ, যা তিনি স্পষ্ট ভাবেই নিষেধ করে দিয়েছেন। কারও প্রতি মানুষের
ব্যাক্তিগত ভালোবাসা ঈশ্বরের আজ্ঞার চাইতে কখনই বড়ো হতে পারে না। মানুষের ভালোবাসা
সময়ের সাথে সাথে পাল্টে যায়, কালের নিয়মে শিথিল হয়ে
যায়; কিন্তু ঈশ্বরের দেওয়া বাণী কোনদিনও পাল্টায় না।
যদি একটা মানুষকে বিবাহ করার জন্য একজন খ্রীষ্টান প্রভুর দেওয়া আজ্ঞা লঙ্ঘন করে, তাহলে সে পাপ করে! এমন ধরণের কাজ করা ব্যাক্তি ঈশ্বরের কাছ থেকে কোন
আশীর্বাদ পায়না। সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বর এমন কোন ব্যাক্তিকে আশীর্বাদ দান করেন না, যে ব্যাক্তি তাঁর পবিত্র বাণীকে অমান্য ক’রে এবং তাঁর ঐশ আজ্ঞা লঙ্ঘন
করে নিজের ইচ্ছা মতো চলে। মানুষের ব্যাক্তিগত ভালোবাসা আর খ্রীষ্টবিশ্বাসকে একসাথে
গুলিয়ে ফেললে হবে না। সম্পর্ক যাই হোক না কেন, মানুষের
প্রতি আমাদের ভালোবাসা, যদি খ্রীষ্ট ও তাঁর পবিত্র
বাণীর চাইতে বেশী হয়ে যায়, তবে একদিন আমাদেরকে এর
মাশুল দিতে হবে। আমরা যাদের আপনজন বলে মনে করি, এমন
একটা সময় আসবে যখন তাদের কাউকেই আমরা আর পাশে পাবো না। কারণ সব শেষে মানুষ নিজের
কথাই ভাবে। দিনের শেষে আমরা সবাই একা। তাই ভালবাসার দোহাই দিয়ে, ঈশ্বরের আজ্ঞা লঙ্ঘন করে এবং তাঁর অন্তরে দুঃখ দিয়ে, অন্য ধর্মের মানুষকে বিয়ে না করাটাই আমাদের খ্রীষ্টীয় কর্তব্য। একটা
কথা মনে রাখবেন, আপনি নিজের ইচ্ছায় কাউকে ভালবেসে
বিয়ে করতে পারেন বটে, কিন্তু তার আত্মার পরিত্রাণ
করবার সাধ্য আপনার কিন্তু নেই। “তুমি স্ত্রী, তোমার
স্বামীকে পরিত্রাণ করতে পারবে কি না, এই বিষয়ে কীই
বা জানো তুমি? তেমনি স্বামী, তুমি তোমার স্ত্রীকে পরিত্রাণ করতে পারবে কি না, এই বিষয়ে কীই বা জানো?” (১ করিন্থীয় ৭:১৬)।
আমি দেখেছি, দুজন মানুষ একসাথে ৫ বছর, ৮ বছর কিংবা ১০ বছর ভালোবাসার সম্পর্কে থাকার পরেও, বিয়ে করার কয়েক মাস বা কয়েক বছর পরে বিবাহ বিচ্ছেদ (Divorce) করে নিয়েছে। আবার এও দেখেছি, যে দুজন
মানুষ পরস্পরকে জানতো না চিনতো না, বিয়ের পর তারা
ভালো ভাবে ঘর সংসার করছে। মানুষের একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে। যা কাছে পাওয়ার জন্য
মানুষ যত বেশী আকুলি বিকুলি করে, সেটা কাছে পাওয়ার
পর সে আর কোনও মূল্য দেয়না।সেটা তখন অবহেলায় পড়ে থেকে নষ্ট হয়ে যায়। আসলে কারও
সাথে প্রেম ভালোবাসা করা আর ঘর সংসার করাটা এক পর্যায়ে পড়ে না। এই কথাটা আমি
প্রবীণ মানুষদের কাছ থেকে শিখেছে। তাদের কাছ থেকে এও শুনেছি, কারও সাথে ভালোবাসা আছে মানেই যে তার সাথে সুখে ঘর সংসার করা যাবে, এমনটা ভাবা উচিত নয়।
বর্তমানে খ্রীষ্টানদের একাংশের মধ্যে সৎ বিবেচনার অনেক অভাব দেখা দিয়েছে। জগতের ধ্যান ধারণা ও খ্রীষ্টবিশ্বাস বিরোধী ভুল শিক্ষাগুলো তাদের অন্তরে আজ বসে আসে। কেন খ্রীষ্টানদের একাংশ অন্য ধর্মের মানুষের সাথে বিবাহ করছে, এর মূল কারণ বুঝতে হলে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন। যেগুলি হলঃ
১) খ্রীষ্টান
মা-বাবার সঠিক অনুশাসন ও ধর্মশিক্ষা প্রদানের অভাব
একটা খ্রীষ্টান পরিবারে যখন একটা সন্তানের জন্ম হয়, তখন মা-বাবার উপরেই প্রধান দায়িত্ব বর্তায় সে তার সন্তানকে পবিত্র
খ্রীষ্টীয় শিক্ষায় মানুষ করে তুলবে। ছেলেবেলা থেকেই তাকে খ্রীষ্টধর্মের মৌলিক বিষয়
ও খ্রীষ্ট মণ্ডলীর ধর্মশিক্ষা সম্বন্ধে জানিয়ে না দিলে, সেই সন্তান পরে গিয়ে ভুল পথে চলে যায়। যে সন্তান ছেলেবেলায় তার
মা-বাবার কাছ থেকে সঠিক শিক্ষা পায়না, বয়সে বৃদ্ধি
পাওয়ার পর তার পক্ষে সেই পথে চলা সম্ভব নয়।
পবিত্র বাইবেলে লেখা আছে: “শুরু থেকেই কিশোরকে সঠিক পথে চলতে শেখাও; সে বৃদ্ধ বয়সেও সেই পথ থেকে সরে যাবে না কখনো” (প্রবচন ২২:৬)।
২) খ্রীষ্টান মা-বাবার ব্যাক্তিগত জীবনে
খ্রীষ্টীয় আদর্শের অভাব
সন্তানেরা শুধুমাত্র তার মা-বাবার মুখের কথা শুনে চলতে চায়না; কিন্তু মা-বাবার আচরণ, জীবনশৈলী ও কাজকর্মের ধরণ লক্ষ্য করে তা দেখেই অনুপ্রাণিত হয়। এখন মা-বাবা যদি ধার্মিক মানুষ না হয়, তাদের জীবনে যদি প্রার্থনার অভাব থাকে, তাদের মধ্যে যদি পবিত্র বাইবেল নিয়মিত চর্চার অভাব থাকে, তারা যদি খ্রীষ্টধর্মের মৌলিক শিক্ষাকে হাল্কা চালে নিয়ে থাকে, তারা যদি তাদের সন্তানের সামনে পরস্পরের সঙ্গে অশোভন আচরণ করে, পরস্পরকে অশালীন কথা বলে বা একে অন্যের গায়ে হাত তোলে এবং তারা যদি ধর্মনিরপেক্ষ মানসিকতার মানুষ হয়ে থাকে; এক্ষেত্রে তাদের সন্তান যে তাদের শ্রদ্ধাভক্তি করবে না, পরে ভুল পথে যাবে ও খ্রীষ্টবিশ্বাস বিরোধী কার্যকলাপ করবে তাতে আশ্চর্য হওয়ার মতো কিছুই নেই। সন্তানেরা হল মা-বাবার দর্পণ। গাছ ভালো হলে তার ফলও ভালো হয়।
৩) খ্রীষ্টান পরিবারে পবিত্র বাইবেল নিয়মিত পাঠ ও
অধ্যায়নের অভাব
পবিত্র বাইবেল হলো খ্রীষ্টানদের জীবন পথের দিশারী। জীবনের সকল প্রয়োজনীয় শিক্ষা যথাযথ ভাবে পবিত্র এই শাস্ত্রে লিপিবদ্ধ করা আছে। তাই একজন খ্রীষ্টানের কাছে পবিত্র বাইবেলের অন্য কোন আর বিকল্প নেই। একজন খ্রীষ্টানকে কেমন ভাবে জীবন যাপন করা উচিত, কেমন ধরণের মানুষের সাথে বন্ধুত্ব ও মেলামেশা করা উচিত এবং কাদের সাথে বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপন করা উচিত বা উচিত নয়; সেই সবই পবিত্র বাইবেলে স্পষ্টভাবেই উল্লেখ করা আছে। কিন্তু অনেক খ্রীষ্টান পরিবারে আজ পবিত্র বাইবেলের চর্চা হয়না। মা-বাবা তার সন্তানদের পবিত্র বাইবেলের আজ্ঞাগুলি পাঠ করে শোনায় না। আজ তার জায়গা নিয়েছে টেলিভিশনের ধারাবাহিক সিরিয়াল, মুঠো ফোনের রঙিন জগত ও সস্তার যৌন আবেদনময় বিনোদন। তারা তাদের প্রভু ঈশ্বরকে ও তাঁর জীবনপরিত্রায়ী বাণী জানে না। জানে শুধু বাইরের ঐ জগতটাকে; যা মিথ্যাচার, লালসা আর নোংরামিতে ভরা!
৪) মণ্ডলীর পরিচালকদের তার সদস্যদের প্রতি
উদাসীনতা ও অবিভাবকশুলভ পরিচর্যার অভাব
খ্রীষ্টমণ্ডলীকে পরিচালনা করার গুরু দায়িত্ব রয়েছে যাদের হাতে, তারা হলেন অভিষিক্ত যাজক ও অন্যান্য আধ্যাত্মিক পরিচালক এবং পলকগণ। খ্রীষ্টমণ্ডলীতে তাদের ভূমিকা, ঠিক যেন আদি খ্রীষ্টমণ্ডলীর প্রেরিত শিষ্যদের মতো। যাদের বিনিদ্র তত্ত্বাবধানে বেড়ে উঠেছিল খ্রীষ্টবিশ্বাসীদের সংখ্যা এবং যীশু খ্রীষ্টের মঙ্গলসমাচার ছড়িয়ে পড়েছিল পৃথিবীর শেষ প্রান্তে। তবে বর্তমান যুগের মণ্ডলীতে দৃশ্যটা একেবারে অন্য রকমের। আজকাল মণ্ডলী পরিচালনা করার দায়িত্বে যারা আছেন, তারা নিজেরাই সঠিক খ্রীষ্টীয় শিক্ষার অভাবে ভুগছে। মণ্ডলীর পরিচালক হিসেবে তাদের কর্তব্য ও অন্যান্য দায়িত্ববোধের বিষয়ে তারা বর্তমানে যথেষ্ট শিথিল হয়ে পড়েছে। এছাড়াও মণ্ডলীর অনেক পরিচালকদের মধ্যে ব্যাক্তি বিশেষে পক্ষপাতিত্ব দেখা দিয়েছে। যা সম্পূর্ণভাবেই খ্রীষ্টবিরোধী একটি আচরণ।কিছুজন আবার অর্থের কাছে মাথা নত করে দিয়েছে এবং অর্থবান ব্যাক্তিদের ইচ্ছা অনুযায়ী, তাদের তোষামোদ করে চলে। এমন অবস্থায় মণ্ডলীর সদস্যরা গীর্জায় যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। আজ বহু খ্রীষ্টান মণ্ডলী ত্যাগ করেছে, মণ্ডলীতে আসা বন্ধ করে দিয়েছে বা অন্য কোন জায়গায় চলে গেছে, মণ্ডলী পরিচালকদের সঠিক পরিচালনা ও পিতৃসুলভ আচরণের অভাবে। প্রতিটি অভিষিক্ত যাজক ও পরিচালকদের প্রধান দায়িত্ব হলো মণ্ডলীর সদস্যদের প্রেরিত শিষ্যদের প্রাচীন খ্রীষ্টীয় পরম্পরা অনুযায়ী পরিচালনা করা ও পবিত্র বাইবেল ভিত্তিক ধর্মশিক্ষা দেওয়া। বিশেষ করে খ্রীষ্টীয় উপাসনা ও ধর্মীয় বিশুদ্ধ জীবন যাপনের বিষয়ে, খ্রীষ্টীয় বিবাহের বিষয়ে এবং প্রার্থনাময় জীবনের বিষয়ে।
৫) খ্রীষ্টানদের অন্য ধর্মের মানুষের সাথে অবাধ
মেলামেশা
বর্তমানে খ্রীষ্টানদের একাংশের অধঃপতনের মূল কারণ হল অন্য ধর্মের মানুষের সাথে অবাধ মেলামেশা করা।এমনটা নয় যে অন্য ধর্মের মানুষ খারাপ। কিন্তু বিষয়টি হল খ্রীষ্টীয় শিক্ষা ও অন্য ধর্মের শিক্ষা এক নয়। বিধর্মীদের জীবন যাপনের ধরণ আর খ্রীষ্টানদের জীবন যাপনের ধরণ এক নয়।অন্য ধর্মের মানুষের সাথে মেলামেশা করতে গিয়ে অনেক খ্রীষ্টান বিশ্বাসের পথ থেকে সরে গেছে।খ্রীষ্টীয় জীবন হল প্রার্থনাময় পবিত্র জীবন। সেটা না করে তারা বিধর্মীদের মতো এমন সব কাজকর্ম করে বেড়াচ্ছে যা পবিত্র বাইবেল অনুসারে ধর্ম বিরোধী এবং খ্রীষ্টানদের তা করতে নেই। এই ধরণের ব্যাক্তিরা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতা আর আধুনিকতার নামে ঐ সকল মানুষের সাথে মেলামেশা করে।একজন প্রকৃত খ্রীষ্টান অবিশ্বাসীদের সাথে শুধুমাত্র মঙ্গলসমাচার প্রচারের উদ্দেশ্যেই মেলামেশা করতে পারে এবং মানবিকতার খাতিরে বিপদের সময়ে তাদের পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ ভাবে মেলামেশা করা কিংবা তাদের সাথে বিয়ে করা, পবিত্র বাইবেলে নিষেধ আছে। এটাও সত্যি যে, কিছু বিবেকহীন খ্রীষ্টান নিজেদের ব্যাক্তিগত স্বার্থেই অন্য ধর্মের মানুষের সাথে মেলামেশা করে।
উল্লেখিত যে সকল বিষয়গুলি আলোকপাত করা হল, সে সবই খ্রীষ্টানদের অন্য ধর্মের মানুষের সাথে বিবাহ করার পিছনে বিশেষ
ভূমিকা পালন করছে। পবিত্র বাইবেলে প্রভু যীশু খ্রীষ্ট বলেছেন, খ্রীষ্টানদের অন্য জাতি, ধর্ম ও
সম্প্রদায়ের মানুষের থেকে আলাদা করে রাখা হয়েছে (যোহন ১৫:১৯)। এই কথাটা যারা বোঝে
তারা কখনই মিশ্র বিবাহের দিকে এগিয়ে যাবে না। এমনকি অন্য ধর্মের মানুষের সাথে
প্রেম ভালোবাসার সম্পর্কে জড়িয়েও পরবে না। এতে নিজের ধর্মকে অবমাননা করা হয়। কোন
ব্যাক্তির পক্ষেই নিজের ধর্মের বাইরে গিয়ে অন্য ধর্মের মানুষের সাথে বিবাহ করা
উচিত নয়। যারা ভালোবাসার দোহাই দিতে চায়, তাদের
প্রশ্ন করা উচিত যে, তারা কি নিজের ধর্মের মানুষকে
ভালবাসতে পারে না? আপন ধর্মের মানুষগুলো কি খুবই
খারাপ? কথাটা আমি খ্রীষ্টানদের উদ্দেশ্য করেই বললাম।
সত্যি কথা বলতে, এরা প্রকৃত অর্থে খ্রীষ্টান নয়! এরা
হল নামধারী খ্রীষ্টান। এরা নিজেদের ধর্মের বিষয়ে ঠিকমতো জানে না, আবার অন্য ধর্মের বিষয়েও এরা নিজেদের জড়িয়ে ফেলে। এরা হল দুনৌকোয় পা
দিয়ে চলা লোক। “তারা ধর্মের ঠাট বজায় রাখবে বটে, কিন্তু
নিজের জীবনে ধর্মের প্রকৃত শক্তির কোন স্থানই রাখবে না। তাই বলছি, অমন লোকদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চল তুমি” (২ তিমথি ৩:৫) । [‘তারা’ বলতে
এখানে নামধারী খ্রীষ্টানদের বোঝানো হয়েছে]
আপনি কখনো কি ভেবে দেখেছেন, কি ভাবে দুটো ভিন্ন ধর্মের মানুষ বিয়ে করে একসাথে থাকতে পারে? যদি আপনার উত্তর হয়, তারা পরস্পরকে
ভালোবেসে এক সাথে থাকে, তাহলে আপনি ভুল ভাবচ্ছেন।
শুধুমাত্র নিছক ভালোবাসা দিয়ে মানুষের জীবন চলে না। জীবন চালাতে গেলে বাস্তব
জীবনের সাংসারিক প্রয়োজনীয়তা মেটাতে হয়। আর তার জন্য লাগে অর্থ। আসলে দুটো ভিন্ন
ধর্মের মানুষ কখনই একসাথে বিয়ে করে থাকতে পারে না, যদি
না তাদের মধ্যে কেউ একজন নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে বোঝাপড়া (Compromise) করে নেয়। ধরুন একজন খ্রীষ্টান, সে নিজের
ধর্মকে নিষ্ঠার সঙ্গে মেনে চলে, অন্য দিকে একজন
হিন্দুও তার ধর্মকে নিষ্ঠার সঙ্গে মেনে চলে; এদের
দুজনের মধ্যে কখনই বিবাহ হতে পারে না। কারণ এই দুটি ধর্মের ভিত্তি ও মৌলিক শিক্ষা
সম্পূর্ণ আলাদা। এবার ধরুন একজন খ্রীষ্টান, সে একজন
হিন্দুকে বিয়ে করার জন্য তার মন যুগিয়ে চলতে লাগলো এবং তার ধর্মীয় উপাসনায়
অংশগ্রহণ করতে লাগলো। অপরদিকে হিন্দুটিও একই কাজ করলো। আপনার মতে কি বলে, এরা দুজনেই কি নিজের ধর্মকে সম্মান করে? অবশ্যই
না! এদের কাছে ধর্মটা হলো নেহাতই সামাজিক পরিচয় বহন করার বস্তু মাত্র। এই কারণেই
দুটো ভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে বিয়ে হওয়াটা অন্যায্য বিষয়। এখানেই কথা শেষ হলো
না। এরপর তাদের যখন সন্তান হবে, তারা তাকে কোন
ধর্মের শিক্ষা অনুযায়ী মানুষ করে তুলবে? খ্রীষ্টধর্ম
অনুযায়ী না কি যাকে বিয়ে করেছে তার ধর্ম অনুযায়ী? সন্তান
প্রাপ্ত বয়স্ক হলে কার ধর্ম পালন করবে? মায়ের না
বাবার? বিষয়টি অদূর ভবিষ্যতে কোন দিকে যেতে পারে সে
বিষয়ে আপনার কোন ধারণা আছে? অবশ্য যাদের ধর্মীয়
জ্ঞান নেই, তাদের কাছ থেকে ঐ গভীর চিন্তা আশা করাটাই
বৃথা। মিশ্র বিবাহের কারণে আজ অনেক পরিবার নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক মানুষকে ঘর ছাড়া
হতে হয়েছে। আজ আমাদের সমাজে ভিন্ন ধর্মের মধ্যে আভ্যন্তরীণ দন্ধ শুরু হয়েছে ঐ
মিশ্র বিবাহেরই কারণে।
পবিত্র বাইবেল অনুযায়ী, খ্রীষ্টানদের পক্ষে অন্য ধর্মের মানুষকে বিবাহ করাটা পাপের সমস্যা নয় কিন্তু প্রজ্ঞাজনিত সমস্যা। [For Christians, marrying a Non-Christian is not a sin issue but wisdom issue.] সেই মানুষকেই বিবাহ করা বুদ্ধিমানের কাজ, যার সঙ্গে আপনার ধর্মীয় বিশ্বাসের মিল আছে। যার সঙ্গে আপনার জীবনের গন্তব্য একই। ঈশ্বরের মনোনীত মানুষেরা যখন তাঁর আজ্ঞা লঙ্ঘন করে অন্য ধর্মের মানুষকে বিবাহ করে তখন তার কি পরিণাম হয়, তার অনেক বাস্তব উদাহরণ পবিত্র বাইবেলে উল্লেখ করা আছে। তেমন কয়েকটা ঘটনার কথা নিচে উল্লখ করা হলো।
ইস্রায়েলীয়রা বিধর্মী নারীদের সাথে ঘনিষ্ঠ
সম্পর্কে জড়িয়ে মহাবিপদে পড়লো
মোয়াব দেশের প্রান্তরভূমিতে অবস্থিত ছিল শিত্তীম নামের এক এলাকা। এটা ছিল জর্ডন নদীর ওপারে জেরিখোর ঠিক উল্টো দিকে। তারা এই এলাকা হয়ে ঈশ্বরের দেখানো তাদের প্রতিশ্রুত দেশ কানানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।মাঝে তারা ঐ শিত্তীম এলাকায় কিছুদিনের জন্য থেমেছিল। সেখানে থাকবার সময়, ইহুদী পুরুষেরা, স্থানীয় মোয়াবীয় মেয়েদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লো। এমনকি তাদের সঙ্গে যৌন সম্পর্কেও লিপ্ত হলো। তখন সেই মোয়াবীয় মেয়েরা তাদের দেবতার উদ্দেশে যে সব বলি উৎসর্গ করতো, তারা তখন সেই ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ইহুদীদের নিমন্ত্রণ জানাতে লাগলো। যদিও ইহুদীদের পক্ষে অলীক দেবদেবীদের ধর্মীয় উপাসনায় অংশগ্রহণ করা অনুচিত ও ঈশ্বর বিরোধী কাজ ছিল, কিন্তু সেই স্থানীয় মেয়েদের সাথে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের খাতিরে তারা ঈশ্বরের আজ্ঞা লঙ্ঘন করে ঐ সব ধর্মীয় বলিতে অংশ গ্রহণ করলো এবং ওদের ঐ অলীক দেবদেবীদের পূজাও করতে লাগলো। একটা সময় এমন এলো যে, তারা মোয়াবীয়দের অলীক দেবতা ‘বায়াল-পেয়োরের’ অনুগামী হয়ে উঠলো।ঈশ্বর তখন তাদের উপর খুবই অসন্তুষ্ট হলেন। সেই সময় ইহুদীদের মধ্যে এক ভয়ংকর মহামারী শুরু হলো, যাতে চব্বিশ হাজার ইহুদী প্রাণে মারা গেল। এই ভাবেই ইহুদী পুরুষদের অন্য ধর্মের মেয়েদের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার মাশুল দিতে হয়েছিল। (গণনা পুস্তক ২৫:১-৯)।
মহাশক্তিধর সামসোন বিধর্মী নারীর প্রেমে পড়ে
বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হলো এবং শেষে নিজের প্রাণ হারালো
একসময়ে ইহুদী জাতিকে শত্রু ফিলিস্টিনদের হাত থেকে রক্ষা করবার জন্য প্রভু ঈশ্বর, ‘দান-গোষ্ঠীর’ মানোয়া নামে এক ব্যাক্তির বাড়ীতে তাঁর এক স্বর্গদূতকে পাঠালেন। এই ব্যাক্তির স্ত্রী ছিল বন্ধা।তাদের কোনও সন্তান ছিল না। ঈশ্বরের পাঠানো ঐ স্বর্গদূত তখন তার স্ত্রীর কাছে এসে বললেনঃ “শোন, যদিও তুমি বন্ধা, তোমার সন্তান হয়নি, তবুও তুমি এবার গর্ভধারণ করবে, একটি পুত্রের জন্ম দেবে। তাই এখন থেকে সাবধান থেকোঃ কোন সুরা বা কোন রকম উগ্র পানীয় খেয়ো না তুমি, আর অশুচি কোন খাদ্যও মুখে দিয়ো না! কেন না শীঘ্রই গর্ভধারণ করবে তুমি, একটি পুত্রের জন্ম দেবে। তার মাথায় যেন ক্ষুর কখনো না পড়ে, কেন না মাতৃগর্ভে আসার সময় থেকেই ছেলেটা হবে একজন নাজিরিৎ, ঈশ্বরের কাছে নিবেদিত একটি মানুষ। ফিলিস্টিনদের হাত থেকে ইস্রায়েল জাতিকে উদ্ধার করার কাজ সেই শুরু করে দেবে।”
সময় মতো সামসোনের জন্ম হলো এবং তার মা বাবা তাকে ঠিক সেই ভাবেই মানুষ করে তুললো, যেমনটা স্বর্গদূত নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিল। এই সামসোন যখন বয়সে বেড়ে উঠলো তখন সে বিপুল শক্তির অধিকারী হয়ে উঠলো। ঈশ্বরের আত্মিক প্রেরণা তার উপর অধিষ্ঠিত ছিল। তার শরীরে এত ক্ষমতা ছিল যে, তার সঙ্গে কেউ পেড়ে উঠত না; কি মানুষ, কি পশু। অথচ এই সামসোনই একদিন জীবনে একটা বড় ভুল করে বসলো। যে শত্রু জাতি ফিলিস্টিনদের হাত থেকে ইস্রায়েলীয়দের উদ্ধার করার জন্য তার জন্ম হয়েছিল, সে কি না, ঐ জাতীরই এক নারীর প্রেমে পড়লো এবং তাকে বিয়ে করলো। তার মা বাবার এই বিয়েতে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও সে কিন্তু তাদের কোন কথাই মানলো না। বিয়ের দিন, সামসোন একটা ধাঁধা শোনালেন আর সেখানকার লোকদের বললেন, কেউ যদি তার অর্থ বলে দিতে পারে, তাহলে তারা পুরস্কার পাবে। আর যদি তারা সেটার অর্থ বলে দিতে না পারে, তাহলে তাদেরকেই সামসোনকে পুরুস্কার দিতে হবে। বিয়ের সাত দিন কেটে যাওয়ার পড়েও তারা যখন সেই ধাঁধার অর্থ বলতে পারলো না, তখন ঐ স্থানীয় ফিলিস্টিন লোকগুলো সামসোনের স্ত্রীর কাছে এসে বললো, তুমি তোমার স্বামীর কাছ থেকে ঐ ধাঁধার অর্থ জেনে নাও, নইলে আমরা তোমাকে আর তোমার বাপের বাড়ীর সকলকে পুড়িয়ে মারবো। সেই ভয়ে সামসোনের স্ত্রী অনেক পিড়াপীড়ি করে সেই ধাঁধার অর্থ জেনে নিয়ে তাদেরকে জানিয়ে দিল। কিন্তু পড়ে যখন সামসোন সত্যিটা জানতে পারলো, তখন সে ঐ লোকগুলোকে শাস্তি দিল আর স্ত্রীর উপর রাগ করে নিজের বাড়ীতে ফিরে গেল।এর মাঝে মেয়ের বাবা প্রাণের ভয়ে নিজের মেয়েকে ঐ স্থানীয় লোকদের একজনের হাতে তার স্ত্রী হিসেবে তুলে দিল। সামসোন ফিরে এসে যখন সেটা জানতে পারলো তখন সে ওখানকার ফিলিস্টিনদের শাস্তি দিল। প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ফিলিস্টিনরা সামসোনের স্ত্রী আর শ্বশুরকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারলো। তখন ঈশ্বরের আত্মিক প্রেরণা সামসোনের উপর ভর করলো আর সে একটা গাধার চোয়ালের টাটকা হাড় দিয়ে এক হাজার ফিলিস্টিনকে মেরে ফেললো। ফিলিস্টিনের লোকেরা ভাবতে লাগলো কি ভাবে সামসোনের সর্বনাশ করা যায়। কিন্তু সেটার উপায় খুঁজে পাচ্ছিল না। সামসোন এবারেও একটা ভুল করে বসলো। সে দেলীলা নামের একটা ফিলিস্টিনি মেয়ের আবারও প্রেমে পড়লো। ফিলিস্টিনের রাষ্ট্র প্রধানেরা এবার বড় একটা সুযোগ হাতে পেল। তারা দেলীলাকে এসে বললো, সামসোন এত শক্তি কোথা থেকে পাচ্ছে সেটা ওর কাছ থেকে কায়দা করে জেনে নাও, তাহলে আমরা প্রত্যেকে তোমাকে এগারো শো শেকেল রুপো দেব। দেলীলা ঠিক তাই করলো।সে সামসোনকে আবেগের কায়দায় ফেলে তার ঐ মহাশক্তির রহস্য জেনে নিল। সামসোন দেলীলাকে ভালোবাসলেও, দেলীলা কিন্তু তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলো। ফিলিস্টিনরা সামসোনের দুটো চোখ উপড়ে ফেলেছিল। অবশ্য সামসোন তার মৃত্যুর সময় শেষবারের মতো এত ফিলিস্টিনিদের মেরে ফেলেছিল, যেটা সে তার সারা জীবনে করেনি। (বিচারকচরিত ১৪,১৫ এবং ১৬)।
রাজা সামুয়েলের বিধর্মী নারীদের সাথে বিবাহ এবং
ইস্রায়েল জাতীর পতন
রাজা সলোমন বাইবেলের একজন বিখ্যাত জনপ্রিয় চরিত্র।
তিনি রাজা দাউদের পুত্র। তবে এনার জীবনের কাহিনী আমাদের হতাশ করে দেয়। পবিত্র বাইবেলে লেখা আছে, প্রভু ঈশ্বর রাজা সলোমনকে অসামান্য প্রজ্ঞা দিয়েছিলেন এবং এমনই জ্ঞান
বুদ্ধি দিয়েছিলেন, যা এই জগতে কারও ছিল না। তার সাথে
প্রভু তাকে দিয়েছিলেন বিপুল ধনসম্পত্তি যার কোনও হিসেব নেই। অথচ এই মানুষটাই এমন
কিছু কাজ করে বসলো যা গোটা জাতীর পতন ঘটালো। রাজা সলোমন, ফারাওয়ের কন্যা ও অন্যান্য বিধর্মী নারীদের ভালবেসেছিলেন। যাদের বিষয়ে
ঈশ্বর ইস্রায়েলীয়দের সতর্ক করে বলেছিলেন, ওদের কারও
সাথে মেলামেশা করবে না, তাহলে ওরা ওদের দেবতাদের
প্রতি তোমাদের অন্তরে অনুরাগ জাগিয়ে তুলবে আর তোমরা সত্যের পথ থেকে দূরে সরে যাবে।
কিন্তু রাজা সলোমন সেই নিষেধ মানেন নি। তিনি ঐ সমস্ত নারীদের প্রেমে পড়েছিলেন। তার
মোট ৭০০ জন স্ত্রী এবং ৩০০ জন উপস্ত্রী ছিল। এরা সকলেই বিধর্মী ছিল। ক্রমে তাঁর ঐ
বিধর্মী স্ত্রীরা তাদের অলীক দেবদেবীর প্রতি তাঁর মনের মধ্যে ভালোবাসা জাগিয়ে
তুললো আর রাজা সলোমন ঈশ্বরের আজ্ঞা লঙ্ঘন করে সেই সব অলীক দেবদেবীদের পূজা করতে
লাগলেন। ঈশ্বর রাজা সলোমনকে দুবার দেখা দিয়েছিলেন কিন্তু তবুও তিনি ঈশ্বরের সতর্ক
গ্রাহ্য করলেন না। এর ফল হয়েছিল ভয়ংকর। তাঁর ঐ বিধর্মী নারীদের সাথে বিবাহ করার
ফলে, পরবর্তীকালে ইস্রায়েল জাতীর উপর অভিশাপ নেমে
এসেছিল এবং ইস্রায়েল জাতি, ‘উত্তর রাজ্য এবং দক্ষিণ
রাজ্য’ নামে দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একসময় উত্তর থেকে আসীরিয়ার রাজা এসে
ইস্রায়েলের ‘উত্তর রাজ্য’কে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয় এবং দাউদ বংশ নিজেদের সিংহাসন
হারায়। তারপর থেকে ইস্রায়েল জাতি আর আগের মতো গৌরব ধরে রাখতে পারেনি। তারা
বিধর্মীদের দাসত্ব করেছে (১ রাজাবলী ১১, ১২)।
ঈশ্বরের মনোনীত জাতীর মানুষেরা অন্য ধর্মের মানুষের সাথে বিবাহ করলে ও তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ ভাবে মেলামেশা করলে তার শেষ পরিণাম যে কি হতে পারে, তার কয়েকটি উদাহরণ আমরা পড়লাম। পবিত্র বাইবেলে এই ধরণের আরও কয়েকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা আছে যা আমাদের সামনে আজও সতর্কবাণী শোনাচ্ছে। জ্ঞানী ব্যাক্তিরা এই সকল বিষয় অবহেলা করেনা আর অহংকারী মূর্খেরা তা জেনেও নিজের ইচ্ছামতো চলতে থাকে। একটা পুরানো প্রবাদ আছেঃ “ইতিহাস নিজের পুনরাবৃত্তি করে!” মিশ্র বিবাহ যে কোন সমাজ ব্যাবস্থার পক্ষে ক্ষতিকর। মিশ্র বিবাহের ফল সঙ্গে সঙ্গে দেখা দেয়না। কিছু বছর বা কয়েকটা প্রজন্মের পর এর কুফল দেখতে পাওয়া যায়। এর একটা নিশ্চিত ফলাফল হলো, যে কোন একটি জাতি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। সেই কারণেই ঈশ্বর বাইবেলে, তাঁর মনোনীত জাতীর মানুষকে তাদের ধর্মের বাইরে অন্য কাউকে বিবাহ করতে নিষেধ করেছেন।
খ্রীষ্টানদের অন্য ধর্মের মানুষের সাথে বিবাহ
করতে ও তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে না জড়াতে সাবধানবাণী
“তাদের (অবিশ্বাসী) সঙ্গে কোন
বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপন করো না: পাত্রী রূপে তোমাদের কন্যাদের তাদের পুত্রদের হাতে
সম্প্রদানও করো না, তোমাদের পুত্রদের স্ত্রীরূপে
তাদের কন্যাদের গ্রহণও করো না। তাহলে কিন্তু তোমাদের পুত্রেরা প্রভুর অনুগামী না
থেকে তাঁর কাছ থেকে সরেই যাবে, তারা তখন অন্য যত সব
দেবতারই পূজা করবে। ফলে তোমাদের ওপর জ্বলে উঠবে প্রভুর ক্রোধ; তিনি শীঘ্রই তোমাদের বিলুপ্ত করে দেবেন।” (দ্বিতীয় বিবরণ ৭:৩-৪)
“অন্য যে সব জাতির মানুষেরা তোমাদের
আশে পাশে এখনো রয়েছে, তাদের সঙ্গে মেলামেশা করো না
যেন। তোমরা তাদের দেবতাদের নাম মুখে এনো না, ওই
দেবতাদের নাম নিয়ে শপথ করো না, ওদের সেবা করো না, ওদের সামনে কখনো প্রণত হয়ো না। তোমরা বরং তোমাদের প্রভু ঈশ্বর আঁকড়েই
থাক, যেমন তাঁকে আজ পর্যন্ত আঁকড়েই থেকেছ। প্রভু
তোমাদের জাতির চেয়ে বেশ বড় ও শক্তিশালী নানা জাতিকে তোমাদের সামনে থেকে উৎখাত
করে দেশছাড়া করে দিয়েছেন। আজ পর্যন্ত কেউই তোমাদের সামনে দাঁড়াতে পারেনি।
তোমাদের একা একজন তো হাজার শত্রুকে তাড়াবার ক্ষমতা রাখে, কেন না তোমাদের প্রভু ঈশ্বর নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে নিজেই তোমাদের
পক্ষ নিয়ে সংগ্রাম করে থাকেন। তাই তোমরা নিজেদের সম্বন্ধে খুবই সতর্ক হয়ে থেকো :
তোমাদের প্রভু ঈশ্বরকে ভালইবেসো। তোমরা যদি কখনো বিপথে যাও, ওই যে সব জাতি তোমাদের আশেপাশে এখনো রয়েছে, তোমরা যদি সেই সব জাতির অবশিষ্ট মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চল, তাদের সঙ্গে যদি কোন বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপন কর এবং তোমাদের দুপক্ষের
মধ্যে যদি যাওয়া আসা হয়, তাহলে এই কথা নিশ্চিত
জেনে রাখ, তোমাদের প্রভু ঈশ্বর ওই সব জাতিকে তোমাদের
সামনে থেকে আগের মতো আর উৎখাত করে দেশছাড়া করে দেবেন না। তারা তোমাদের পথে পেতে
রাখা কোন জাল বা ফাঁদেরই মতো হয়ে থাকবে তখন; তারা
হয়ে দাঁড়াবে যেন তোমাদের বুকে হানা চাবুকের আঘাতেরই মতো, যেন চোখে ফুটে যাওয়া কাঁটারই মতো, যতক্ষণ
না তোমাদের প্রভু ঈশ্বর এই যে অমন ভাল দেশটি তোমাদের দিয়েছেন, তোমরা সেই দেশটি থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাও।” (যোশুয়া ২৩:৭-১৩)
“তারা তো নিজেদের এবং নিজেদের
পুত্রদের স্ত্রীরূপে ওই স্থানীয় লোকদেরই কন্যাদের গ্রহণ করেছে। ফলে স্থানীয় ওই
সব জাতির সঙ্গে এই পবিত্র জাতির রক্তের মিশ্রণ ঘটেছে। আর [ঈশ্বরের প্রতি] অমন
অবাধ্যতার অপরাধ তো নেতৃজনেরা ও পদস্থ ব্যক্তিরাই সবার আগে করেছেন! এই কথা শুনে আমি দুঃখে নিজের পোশাকটি ও চাদরটি একবার ছিঁড়ে দিলাম, মাথার ও দাড়ির কিছুটা চুল ছিঁড়ে ফেললাম এবং অন্তরে গভীর বিষাদ নিয়ে
সেখানেই বসে রইলাম।” (এজরা ৯:২-৪)
“তাই তোমরা এখন পাত্রী রূপে তোমাদের
কন্যাদের তাদের (অবিশ্বাসীদের) পুত্রদের হাতে সম্প্রদানও করো না, তোমাদের পুত্রদের স্ত্রী রূপে তাদের কন্যাদের গ্রহণও করো না! তাদের সুখ
সমৃদ্ধির জন্যে তোমরা কখনো কোন রকম চেষ্টাই করো না। এর ফলে তোমরা শক্তিশালী হয়ে
উঠবে এবং এই দেশে সেরা যা কিছু জন্মায়, তোমরা তাই
খেতে পাবে আর শেষে এই দেশ তোমাদের সন্তানসন্ততির হাতে রেখে যেতে পারবে তাদের
চিরসম্পত্তি হিসাবে। ইতিমধ্যে আমাদের যা কিছু ঘটেছে, তা তো আমাদের যত অপকর্মের ফলে, আমাদের
মহা অপরাধের ফলেই ঘটেছে, অবশ্য আমাদের দোষ অন্যায়ের
তোমার আদেশ অমান্য করে, ওই যে সব জাতির লোকেরা এত সব
জঘন্য রীতিনীতি অনুসরণ করে থাকে, তাদের সঙ্গে
বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপন করতে যাব? তুমি কি তাহলে
আমাদের ওপর এতই রুষ্ট হয়ে উঠবে না, যার ফলে শেষে
তুমি আমাদের বিলুপ্তি ঘটাবে? তখন কিন্তু অবশিষ্ট
কেউই থাকবে না, প্রাণে কেউই বেঁচে থাকবে না!”
(যোশুয়া ৯:১২-১৪)
“তাছাড়া সকলে এই প্রতিশ্রুতিও
দিচ্ছে: আমরা পাত্রীরূপে আমাদের কন্যাদের স্থানীয় লোকদের হাতে সম্প্রদানও করব না, আমাদের পুত্রদের স্ত্রীরূপে তাদের কন্যাদের গ্রহণও করব না।” (নেহেমিয়া
১০:৩১)
“তোমরা পাত্রীরূপে তোমাদের কন্যাদের
ওই লোকদের পুত্রদের হাতে সম্প্রদান করবে না এবং তোমাদের পুত্রদের স্ত্রী রূপে বা
নিজেদেরই স্ত্রীরূপে ওদের কারো মেয়েকেও গ্রহণ করবে না!” (নিহেমিয়া ১৩:২৫)
“সাবধান, বাবা, যে কোন অবৈধ সম্পর্কই এড়িয়ে চলো।
আর সবচেয়ে বড় কথা, তোমার পিতৃপুরুষদের বংশের নয়, তেমন কোন মেয়েকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করো না। তোমার পিতার গোষ্ঠীভুক্ত
নয়, বাইরের তেমন কোন মেয়েকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করো
না। আমরা তো প্রবক্তাদেরই সন্তান। নোয়া, আব্রাহাম, ইসায়াক, যাকোব, আদিকালের ওই যাঁরা আমাদের পিতৃপুরুষ, তাঁদের
কথা মনে রেখো, বাবা! মনে রেখো, তাঁরা প্রত্যেকে তাদের জ্ঞাতিভাইদের ঘর থেকেই নিজের নিজের স্ত্রীকে
গ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা তো সন্তানলাভে ধন্য হয়েছিলেন এবং প্রতিশ্রুত দেশ একদিন
তাঁদের বংশধরদেরই অধিকারে আসার কথা। তাই তোমাকেও, বাবা, তোমার জ্ঞাতি ভাইদের বিশেষ ভাবে ভালবাসতে হবে। অন্তরে অহঙ্কারী হয়ে
নিজের জ্ঞাতি ভাইদের, নিজের জাতির পুত্রকন্যাদের
তুচ্ছ করো না তুমি, তাদের ঘর থেকে নিজের স্ত্রীকে
গ্রহণ করতে অস্বীকার করো না। অহঙ্কার তো বহু সর্বনাশ ও বিপর্যয়েরই কারণ হয়ে ওঠে, যেমন শ্রমবিমুখতা অবনতি ও মহাদুর্দশারই কারণ হয়ে ওঠে, শ্রমবিমুখতা তো আকালের জন্ম দেয়।” (তোবিত ৪:১২-১৩)
“যারা খ্রীষ্টে বিশ্বাস করে না, তাদের সঙ্গে কোন রকম সঙ্গতিহীন সম্পর্কের জোয়াল তোমরা নিজেদের ঘাড়ে তুলে নিয়ো না! ধর্ম কি কখনো অধর্মের সঙ্গী হতে পারে? অন্ধকারের সঙ্গে আলোর কি কখনো মেলামেশা চলতে পারে? শয়তানের সঙ্গে খ্রীষ্টের কি কখনো একাত্মতা থাকতে পারে? বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীর মধ্যে কি কখনো স্বার্থের মিল হতে পারে? ঈশ্বরের মন্দির আর ওইসব দেবমূর্তির মধ্যে কি কোন বোঝাপড়া থাকতে পারে? আমরাই তো জীবনময় ঈশ্বরের মন্দির। ঈশ্বর নিজেই সেকথা বলেছেন। তিনি তো বলেছেন: “আমি তাদেরই মাঝখানে বাস করব, তাদেরই মধ্যে করব নিত্য আনাগোনা। আমি হব তাদের আপন ঈশ্বর আর তারা হবে আমার আপন জাতি।” (২ করিন্থীয় ৬:১৪-১৬)
আপনার জন্য এই নিবন্ধটি উপকারি হয়েছে বলেই আমি বিশ্বাস করি। নতুন খ্রীষ্টবিশ্বাসীদের ক্ষেত্রে এটা তাদের ধর্মীয় জ্ঞানের বৃদ্ধি ঘটাবে ও খ্রীষ্টধর্মের মৌলিক বিশ্বাস সম্বন্ধে তাদের আরও অবগত করে তুলবে। সকল পাঠকের কথা ভেবে, আমি আমার ব্যাক্তিগত অভিমত প্রকাশ করিনি, কিন্তু বাইবেল ভিত্তিক উৎস ব্যাবহার করে সত্য তুলে ধরেছি। একজন খ্রীষ্টান লেখক হিসেবে মানুষকে সত্যিটা জানানো আমার কর্তব্য, কিন্তু আমি কারও ব্যাক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারিনা। আপনি যদি এই নিবন্ধ পড়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু জানতে পেরেছেন এবং আপনার মনের কিছু প্রশ্নের উত্তর আপনি পেয়েছেন; তাহলে নির্দ্বিধায় সেই সকল মানুষের সাথে এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন, যাদের এই বিষয়টি জানা খুব দরকার। এই ভাবে আপনি একটি মানুষকে ভুল সিধান্ত নেওয়া থেকে রক্ষা করতে পারবেন।
