ভূমিকা

১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকের নারীবাদী আন্দোলনের দ্বিতীয় ঢেউ প্রথাগত লিঙ্গ-ভূমিকা ভেঙে ফেলা, কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং পিতৃতান্ত্রিক শোষণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘Nuclear Family’ বা একক পরিবারের ধারণাকে ভেঙ্গে ফেলার লক্ষ্য নিয়েছিল। যদিও এই আন্দোলন নারীদের ভোটাধিকারের প্রসার, কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা এবং প্রজনন-সংক্রান্ত স্বাধীনতার মতো আইনি অগ্রগতি অর্জন করেছিল, তবুও ব্যাপক পরিসংখ্যানগত প্রবণতা, দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা এবং বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ থেকে এর গভীর ও অপ্রত্যাশিত কিছু পরিণতির কথা জানা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিবাহবিচ্ছেদের হার বৃদ্ধি, একক অভিভাবক-পরিবারের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, বিবাহ ও সন্তান জন্মদানের হার হ্রাস এবং—বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে—ব্যক্তিগত বা মানসিক সুস্থতার স্পষ্ট অবনতি লক্ষ্য করার মতো। সমাজকে মুক্ত করার পরিবর্তে, চরম ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের ওপর নারীবাদী মতাদর্শের জোর এবং পারিবারিক জীবনের ভিত্তি হিসেবে বিবাহকে অবমূল্যায়ন করার বিষয়টি সামাজিক কাঠামোর দুর্বলতা, শিশুদের সার্বিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব এবং জনমিতি-সংক্রান্ত (Demographic) চ্যালেঞ্জের সাথে সম্পর্কিত হয়ে পড়েছে। এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে বিবাহ, পারিবারিক স্থিতিশীলতা, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং বৃহত্তর সামাজিক প্রভাবের ওপর ভিত্তি করে প্রাপ্ত তথ্য ও প্রমাণ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

 

বিবাহের ওপর আঘাতঃ দোষ-নিরপেক্ষ বিবাহবিচ্ছেদ ও প্রতিশ্রুতিবোধের অবক্ষয়

নারীবাদী আন্দোলনের দাবির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন হয়ে ছিল ১৯৬০-এর দশকের শেষভাগ থেকে শুরু হওয়া ‘No-Fault Divorce’ বা ‘দোষ-নিরপেক্ষ বিবাহবিচ্ছেদ’ আইনের ব্যাপক প্রচলন। এর আগে বিবাহবিচ্ছেদের জন্য কোনো পক্ষের দোষ বা অপরাধ (যেমন—ব্যভিচার বা শারীরিক নির্যাতন) প্রমাণ করা আবশ্যক ছিল, যা বিবাহ টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে একটি প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করত। যেসব অঙ্গরাজ্যে একতরফাভাবে দোষ-নিরপেক্ষ বিবাহবিচ্ছেদের বিধান চালু করা হয়েছিল, সেখানে বিবাহবিচ্ছেদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। লেনোর ফ্রিডবার্গ এবং জাস্টিন উলফার্সের মতো অর্থনীতিবিদদের করা বিশ্লেষণসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে (আইন কার্যকরের ১ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে) জাতীয় পর্যায়ে বিবাহবিচ্ছেদের হার ৭ থেকে ১৩ শতাংশ বৃদ্ধির জন্য সরাসরি এই আইনি সংস্কারগুলোই দায়ী; এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে (১৬ থেকে ২৫ বছর) এই প্রভাব আরও ঘনীভূত হয়েছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের বিবাহবিচ্ছেদের পরিসংখ্যান এই ছবি তুলে ধরে। ১৯৬০ সালে প্রতি ১,০০০ জন জনসংখ্যার বিপরীতে বিবাহবিচ্ছেদের হার ছিল প্রায় ২.২ জন। ১৯৮০ সাল নাগাদ—যখন ‘দ্বিতীয়-পর্যায়ের নারীবাদী আন্দোলন’ (Second Wave Feminism) এবং ‘নো-ফল্ট ডিভোর্স’ বা দোষ-ত্রুটির প্রমাণ ছাড়াই বিবাহবিচ্ছেদের আইনি ব্যবস্থার প্রচলন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়—তখন এই হার দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে প্রতি ১,০০০ জনে ৫.২ জন-এ দাঁড়ায়। ৮০ দশকের শুরুর দিকে প্রতি ১,০০০ বিবাহিত নারীর বিপরীতে বিবাহবিচ্ছেদের হার সর্বোচ্চ ২২.৬-এ পৌঁছালেও, পরবর্তীতে তা কমে বর্তমানে প্রতি ১,০০০ জনে ২.৪–২.৫ জনের-এর ঘরে নেমে এসেছে (সিডিসি-র ২০২৩ সালের সাময়িক তথ্য অনুযায়ী)। 


যদিও দেরিতে বিয়ে এবং বিয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ বাছাই প্রক্রিয়ার (Selectivity) কারণে সাম্প্রতিক সময়ে সামগ্রিক হারে কিছুটা স্থিতিশীলতা বা হ্রাস লক্ষ্য করা গেছে, তবুও প্রতি ১,০০০ বিবাহিত নারীর ক্ষেত্রে বিবাহবিচ্ছেদের হার ১৯০০ সালের তুলনায় এখনো প্রায় চার গুণ বেশি (১৯০০ সালে ৪.১-এর বিপরীতে ২০২২ সালে ১৪.৬)। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে এবং ‘নো-ফল্ট ডিভোর্স’ ব্যবস্থা চালু আছে এমন প্রতিটি বিচারিক এলাকায় বিবাহবিচ্ছেদের উদ্যোগ মূলত নারীরাই নিয়ে থাকেন (প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে); এটি ইঙ্গিত দেয় যে, আইনি প্রক্রিয়ার এই সহজলভ্যতা নারীদের এমন সব দাম্পত্য সম্পর্ক থেকেও বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে ক্ষমতায়িত করেছে, যেখানে সম্পর্কের টানাপড়েন বা সমস্যা খুব একটা বেশী ছিল না।

 

তবে একই সাথে বিয়ের হার হয় স্থবির হয়ে পড়েছে, নয়তো হ্রাস পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ১,০০০ জন মানুষের মধ্যে বিয়ের হার ২০০০ সালের ৮.২ জন থেকে কমে ২০২৩ সালে ৬.১-জন এ নেমে এসেছে; এর পাশাপাশি বিয়ের বিকল্প হিসেবে বহু নারী ‘সহাবস্থান’ বা বিয়ে-বহির্ভূত একত্রে বসবাসের প্রবণতা বেড়েছে, যা মূলত একটি ভঙ্গুর বিকল্প। ‘ইনস্টিটিউট ফর ফ্যামিলি স্টাডিজ’ (IFS)-এর গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৭০-এর দশকের নারীবাদী আন্দোলনের পর প্রতি ১,০০০ জন অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে বিয়ের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। 


ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ন্যাশনাল ম্যারেজ প্রজেক্ট’-এর পরিচালক এবং IFS-এর সিনিয়র ফেলো ব্র্যাড উইলকক্স দেখিয়েছেন যে, কীভাবে এই পরিবর্তনগুলো সমাজে বিবাহ ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল ও কম আকর্ষণীয় করে তুলেছে; এর ফলে নারীবাদী আন্দোলনের পূর্ববর্তী সময়ে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে বিয়ের হার যেখানে ৭২ শতাংশ ছিল, তা বর্তমানে ৫০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। বর্তমানে বহুল প্রচলিত ‘সহাবস্থান’ বা ‘Living Together’ ব্যবস্থাটি বিয়ের মতো স্থায়িত্ব বা আইনি সুরক্ষা প্রদান করতে ব্যর্থ; বরং এতে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার হার বেশি এবং সন্তানদের জন্য এর ফলাফলও তুলনামূলকভাবে খারাপ।

 

পারিবারিক কাঠামোর অবক্ষয়ঃ একক অভিভাবক-পরিবার ও শিশুদের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব

প্রথাগত পরিবার কাঠামোর বিরুদ্ধে নারীবাদী সমালোচনার সমান্তরালেই একক অভিভাবক—বিশেষ করে একক মায়ের (Single Mother)—পরিবারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আদমশুমারি ও সিডিসি (CDC)-র তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬০-এর দশক থেকে ১৯৮০-র দশকের মধ্যে কেবল মায়ের সাথে বসবাসকারী শিশুর হার দ্বিগুণ হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে তা একটি উচ্চ পর্যায়ে স্থিতিশীল থাকে; বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২৩ শতাংশ শিশু একক অভিভাবকের পরিবারে বাস করে, যার মধ্যে ৮০ শতাংশেরও বেশি পরিবারের প্রধান হলেন মা। এই পরিবর্তনের সাথে নারীবাদী আন্দোলনের ফলে সৃষ্ট সেইসব সাংস্কৃতিক ও আইনি পরিবর্তনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে, যা পারিবারিক সংহতির চেয়ে নারীর স্বাধীনতাকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছে। যা সুস্থ স্বাভাবিক পরিবারের চিত্রকে বিকলাঙ্গ করেছে।

 

নারীরা তাদের কাঙ্ক্ষিত আর্থিক ও সামাজিক স্বাধীনতা হাতের মুঠোয় বাগিয়ে আনলো। তবে, শিশুদের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাবগুলো সুনিশ্চিত তথ্যের মাধ্যমে প্রমাণিত হল। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গবেষণায় দেখা গেছে যে, যেসব শিশু একক মায়ের (Single Mother) তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠে, তারা পড়াশোনা, সামাজিক ও মানসিক বিকাশ, স্বাস্থ্য এবং কর্মক্ষেত্রে সাফল্যের দিক থেকে পিছিয়ে থাকে। তাদের ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের হাতে নিগৃহীত হওয়া, কিশোর বয়সে সন্তান নেওয়া এবং হাই-স্কুল বা কলেজ শিক্ষা সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি দেখা দেয়। 


একক অভিভাবক-পরিবারের শিশুদের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ৪২ শতাংশে পৌঁছায়, যা বিবাহিত দম্পতির পরিবারের (প্রায় ৬–১০ শতাংশ) তুলনায় চার গুণেরও বেশি। এর ফলে শিক্ষার ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য; বাবা নেই এমন পরিবারের শিশুদের স্কুল জীবন ত্যাগ সম্ভাবনা বেশি থাকে—এমনকি কিছু পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, হাই-স্কুল থেকে বেড়িয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের ৭১ শতাংশই একক মায়ের পরিবারের (Single Mother) সদস্য।

 

অপরাধ এবং সামাজিক ব্যাধি এই প্রভাবগুলোকে আরও তীব্র করেছে। ১৯৮০-র দশক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের তথ্যে ধারাবাহিকভাবে দেখা গেছে যে, সরকারি সংশোধনাগারে থাকা কিশোর-কিশোরীদের ৭০ শতাংশ এবং কারাগারে থাকা বন্দিদের ৮০ শতাংশই একক অভিভাবক-পরিবার (Single-Parent Home) থেকে এসেছে। শহরাঞ্চলের ওপর পরিচালিত আইএফএস (IFS)-এর গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যেসব শহরে একক অভিভাবকত্বের হার মধ্যক মানের (Median) চেয়ে বেশি, সেখানে সামগ্রিক অপরাধের হার ৪৮ শতাংশ, সহিংস অপরাধের হার ১১৮ শতাংশ এবং হত্যাকাণ্ডের হার ২৫৫ শতাংশ বেশি। পল আমাটোর মেটা-অ্যানালাইসিস-সহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদী গবেষণায় পাওয়া গেছে যে, নারীরা বা মায়েরা আয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া বা নিয়ন্ত্রণ করার পরেও এই পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকে; যা পারিবারিক কাঠামোর স্বতন্ত্র ও কার্যকারণমূলক ভূমিকাকেই তুলে ধরে।

 

 

সুখের কূটাভাসঃ সম্পর্কের টানাপড়েন ও নারীদের সু-স্বাচ্ছন্দ্য

লক্ষ্য করবার মতো বিষয়, স্বায়ত্তশাসন এবং সফল কর্মজীবনের মাধ্যমে নারীবাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ হওয়া সত্ত্বেও, বিষয়গত সুস্থতার তথ্য মহিলা সুখ হ্রাসের কূটাভাস বা “The Happiness Paradox” কে প্রমাণ করে। বেটসি স্টিভেনসন এবং জাস্টিন উলফার্সের সেমিনাল ২০০৯ সমীক্ষা, জেনারেল সোশ্যাল সার্ভে (GSS) এবং ১৯৭০-২০০৬ থেকে আন্তর্জাতিক তথ্য ব্যবহার করে, দেখা গেছে যে সমস্ত জনসংখ্যার গোষ্ঠী, শিক্ষার স্তর এবং শিল্পোন্নত দেশগুলিতে পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য একেবারে এবং আপেক্ষিকভাবে হ্রাস পেয়ছে। ১৯৭০-এর দশকের পূর্বের লিঙ্গ ব্যবধান (নারী সুখী) বিপরীত; ২০০০-এর দশকে, পুরুষরা অনেক মেট্রিক্সে উচ্চতর সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা জানিয়েছেন। ২০২১-২০২২ পর্যন্ত নতুন তথ্যে উঠে আসে, যার মধ্যে Blanchflower et al. (2022, 2024), এ কথা নিশ্চিত করে যে বর্তমান নারীরা অসুখী, উদ্বেগ, বিষণ্ণতায় ভোগেন। আর্থি-সামাজিক ভাবে তারা স্বনির্ভরশীল হলেও নিজেদের জীবন নিয়ে তাদের সন্তুষ্টিও কম।


অন্যদিকে সন্তানসহ বিবাহিত নারীরা ধারাবাহিকভাবে সর্বোচ্চ সুখ এবং সর্বনিম্ন একাকীত্বের কথা জানিয়েছেন। উইলকক্সের বিশ্লেষণ করা জিএসএস (GSS) ও ‘আমেরিকান ফ্যামিলি সার্ভে’-র তথ্য অনুযায়ী, ২২ থেকে ৩৫ বছর বয়সী বিবাহিত মায়েদের ‘অত্যন্ত সুখী’ হওয়ার সম্ভাবনা অবিবাহিত ও সন্তানহীন সমবয়সীদের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি (৪১% বনাম ১৪%)। 


অথচ নারীবাদী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রচারণায় অল্প বয়সে সংসার গড়ার চেয়ে পেশাগত জীবনকে অগ্রাধিকার দেওয়ায়, এবং বিবাহ ও সন্তান ধারণের মানবজীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে বিলম্বিত ও অবজ্ঞা করেছে, যা সম্পর্কের ক্ষেত্রে অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিবাহবিচ্ছেদের ফলে সৃষ্ট আর্থিক ও মানসিক ধকল—বিশেষ করে বিচ্ছেদের পর নারীদের দারিদ্র্যের তীব্র কবলে পড়ার বিষয়টি—নারীর ‘স্বাধীনতার’ সেই বয়ানকে আরও দুর্বল করে দেয়। এমনকি তখনও, যখন তারা যথেষ্ট অর্থ উপার্জন করে।

 

 

জনমিতিক সংকোচনঃ প্রজনন হার-সংক্রান্ত সংকট ও সামাজিক স্থিতিশীলতা

নারীবাদী আন্দোলনের কারণে জন্মহারও ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ১৯৭০-এর দশকেই যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক জন্মহার (TFR) জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রা বা ‘রিপ্লেসমেন্ট লেভেল’ (২.১)-এর নিচে নেমে যায় এবং বর্তমানে তা ১.৬ থেকে ১.৭-এর মধ্যে ওঠানামা করছে। শিক্ষা, পেশাজীবন এবং পরিবার গঠনের বিষয়টি পিছিয়ে দেওয়ার ওপর নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্বের সাথে দেরিতে বিয়ে করা (বর্তমানে নারীদের বিয়ের গড় বয়স ২৮ বছরের বেশি) এবং কম সন্তান নেওয়ার বিষয়টি জড়িয়ে আছে। 


বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে ‘সুযোগ-ব্যয়’ (Opportunity Cost)-এর বিষয়টি জন্মহার হ্রাসের সাথে যুক্ত; আইএফএস (IFS)-এর বিশ্লেষণে দেখা যায়, নারীবাদী আদর্শে অগ্রগামী দেশগুলোতে গৃহীত প্রগতিশীল নীতিমালার মাধ্যমেও এই প্রবণতা উল্টে দেওয়া সম্ভব হয়নি। বিশ্বব্যাপী দেখা যাচ্ছে যে, শিক্ষিত ও পেশাজীবনে মনোযোগী নারীরা সন্তান নেওয়া পিছিয়ে দিচ্ছেন বা সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন; এর ফলে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধি, সমাজকল্যাণ ব্যবস্থার ওপর চাপ এবং শ্রমশক্তির ঘাটতির মতো সমস্যাগুলো আরও প্রকট হয়ে উঠবে। এতে বিশ্বব্যাপী অর্থনীতির উপরে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হবে।

 

সামাজিকভাবে নারীবাদী আন্দোলনের ব্যাপক প্রভাবের মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক বৈষম্য (যেহেতু স্থিতিশীল পরিবার সম্পদ গড়ে তোলে), সামাজিক আস্থার ঘাটতি এবং জনকল্যাণ ও অপরাধ দমনে সরকারি ব্যয়ের বৃদ্ধি। উইলকক্স তাঁর Get Married (২০২৪) গ্রন্থে যুক্তি দিয়েছেন যে, “অভিজাত মহলের বিবাহ-বিরোধী প্রচার শ্রমিক-শ্রেণির পরিবারগুলোর ওপর অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং পরিবার গঠনের ক্ষেত্রে শ্রেণিগত ব্যবধান আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

 

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিভঙ্গি ও অগ্রগতির পথ

উইলকক্সের মতো সমাজবিজ্ঞানীরা আইএফএস (IFS) এবং ‘ন্যাশনাল ম্যারেজ প্রজেক্ট’-এর দীর্ঘদিনের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে মানুষের জীবনে বিবাহ-ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছেনঃ বিবাহিত প্রাপ্তবয়স্করা দীর্ঘজীবী হন, বেশি আয় করেন এবং তারা জীবনের মহত্তম উদ্দেশ্য খুঁজে পান। বিবাহ বিচ্ছেদহীন ও দুই অভিভাবকের (মা-বাবা) অটুট পারিবারিক কাঠামোর মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশুরা বিভিন্ন সূচকে তাদের সমবয়সীদের তুলনায় ভালো ফলাফল করে। যদিও নারীবাদ প্রকৃত বৈষম্যগুলো দূর করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে, তবে নারী ও পুরুষের পারস্পরিক পরিপূরক ভূমিকা এবং বিবাহ-বন্ধনের স্থায়িত্বকে অবমূল্যায়ন ও অবজ্ঞা করার ফলে এর চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে। গবেষকরা উল্লেখ করেন যে, প্রগতিশীল নীতির মাধ্যমে ‘জন্মহার-সহায়ক নারীবাদ’ (Feminism As Natalism) জন্মহারের পতন রোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে, কারণ নারীবাদে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ প্রবল।

 

শেষের কথা

সব শেষে বলা যায়, সিডিসি (CDC)-র বিবাহবিচ্ছেদের প্রবণতা সংক্রান্ত তথ্য থেকে শুরু করে ‘সুখের কূটাভাস’ (Happiness Paradox) এবং একক অভিভাবকত্বে বেড়ে ওঠা সন্তানদের আর্থসামাজিক পরিস্থিতির ওপর করা বিভিন্ন গবেষণা ও পরিসংখ্যান—সবই প্রমাণ করে যে বিবাহ, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং পারিবারিক কাঠামোকে দুর্বল করার ক্ষেত্রে নারীবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মানব সমাজের এই মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে, যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছে শিশু, নারী-পুরুষের সম্পর্কের সমীকরণ এবং জনমিতিক পরিস্থিতির উপরে। ১৯৬০-এর দশকের আগের সেই কঠোর আইনি বিধিনিষেধের যুগে ফিরে না গিয়েও বিবাহের গুরুত্বকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করা এবং নারী ও পুরুষের পরস্পরের প্রতি সম্মান, ভালবাসা ও পরিপূরক কেন্দ্রিক ভূমিকাকে প্রাধান্য দিলে—সমাজের নবজাগরণের ক্ষেত্রে একটি তথ্য-প্রমাণভিত্তিক পথ হতে পারে।

 

তথ্যসূত্রঃ

১. Amato, P. R. (2015). Single-parent households and children's educational achievement. *PMC*, https://pmc.ncbi.nlm.nih.gov/articles/PMC4508674/

২. Blanchflower, D. G., et al. (2022). The female happiness paradox. *NBER Working Paper 29893*. https://www.nber.org/papers/w29893

৩. Brown, S. L., & Lin, I.-F. (2022). The graying of divorce. *PMC*. https://pmc.ncbi.nlm.nih.gov/articles/PMC9434459/

৪. Centers for Disease Control and Prevention (CDC). (2023–2024). National marriage and divorce rate trends. https://www.cdc.gov/nchs/fastats/marriage-divorce.htm

৫. Friedberg, L. (1998). Did unilateral divorce raise divorce rates? *NBER Working Paper 6398*. https://www.nber.org/system/files/working_papers/w6398/w6398.pdf

৬. Institute for Family Studies (IFS). Various reports (2022–2026), including Wilcox, B. analyses on marriage, fertility, and happiness. https://ifstudies.org/

৭. Stevenson, B., & Wolfers, J. (2009). The paradox of declining female happiness. *American Economic Journal: Economic Policy*, 1(2), 190–225. https://law.yale.edu/sites/default/files/documents/pdf/Intellectual_Life/Stevenson_ParadoxDecliningFemaleHappiness_Dec08.pdf

৮. U.S. Census Bureau. (2024). Marriage and divorce visualizations. https://www.census.gov/library/stories/2024/10/marriage-and-divorce.html

৯. Wilcox, B. (2024). *Get married: Why Americans must defy the elites, forge strong families, and save civilization*. HarperCollins.

* ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন, ন্যাশনাল সেন্টার ফর ফ্যামিলি অ্যান্ড ম্যারেজ রিসার্চ (বিজিএসইউ) থেকে নেওয়া অতিরিক্ত উৎস এবং একক-অভিভাবকত্বের ফলাফল ও নো-ফল্ট ডিভোর্সের প্রভাব সম্পর্কিত পিয়ার-রিভিউড গবেষণা সম্বন্ধীয় তথ্যও এই প্রবন্ধের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে।