যুক্তির সূচনা - Argument From The First Cause


যদি কোনও ‘প্রথম কারণ’ না থাকে, তবে আমাদের এই মহাবিশ্ব আসলে একটি বিশাল আকৃতির লম্বা শিকলের মতো, এর একক অংশ (কড়া/আংটা) এটির উপরের একক অংশের সাথে একে অন্যকে ধরে রেখেছে, কিন্তু পুরো শিকলটাই অন্য কোনও কিছুই সাথে আটকে নেই।

 

এই যুক্তিটি আসলে খুব সহজ, স্বাভাবিক, স্বজ্ঞাত এবং সংবেদনশীল। এই যুক্তিকে সন্দেহ বা একে নিয়ে বিতর্ক করার জন্য আমাদের মন তৈরি নয়। কারণ এই যুক্তি মানুষের মনের সহজ একটি প্রবৃত্তির উপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠা, যা আমাদের সকলের মধ্যেই রয়েছে, যা বলে যে সবকিছুর একটি ব্যাখ্যা প্রয়োজন!”। কোন কিছুই কারণ ছাড়া ঘটে না। যা কিছু আছে তার কোনো না কোনো পর্যাপ্ত কারণ আছে।

 

ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য যে সমস্ত যুক্তি রয়েছে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হল সাধু থমাস অ্যাকুইনাসের পাঁচটি উপায় বা “Five Ways” সেই পাঁচটি উপায়ের মধ্যে একটি, পঞ্চমটি হল “মহাবিশ্বের নকশা থেকে যুক্তি, যা আমরা একটি প্রবন্ধে আলোচনা করেছি। এই প্রবন্ধে আলোচনা করবো, “প্রথম কারণের” যুক্তির নিয়ে এবং এই যুক্তি কীভাবে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে পারে।

 

যুক্তির ব্যাখ্যা


দার্শনিকগণ এই যুক্তিকে “The Principle Of Sufficient Reason” বা যথেষ্ট যুক্তির নীতি বলে আখ্যায়িত করেছেন। আমরা প্রতিদিন এই যুক্তি ব্যবহার করি চলি, সাধারণ জ্ঞানে এবং বিজ্ঞানের পাশাপাশি দর্শন ও ধর্মতত্ত্বে। একটা খালি ঘরের ভিতরে হঠাৎ করে আগুন জ্বলে উঠতে দেখলে আমরা এ কথা বলব না যে, “আগুন নিজে থেকেই জ্বলে উঠল!” বরং আমরা একটি কারণ খুঁজব, ধরে নেব ঘরের ভিতরে আগুন জ্বলে ওঠার পিছনে নিশ্চয়ই কোনও কারণ আছে। যদি আমাদের মনে হয় ওই ঘটনার পিছনে বস্তুগত বা যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ নেই, আমরা তখন একটি মনস্তাত্ত্বিক কারণ খুঁজি, আর মনে করি, সম্ভবত কেউ বা কোনও কিছু আমাদের সম্মোহিত করেছে। তারপরেও যদি কোনও কারণ খুঁজে না পাই, তখন শেষ অবলম্বন হিসাবে, আমরা একটি অতিপ্রাকৃত কারণ বা একটি অলৌকিক কারণের সন্ধান করি। কিন্তু কিছু কারণ অবশ্যই আছে, যার ফলে ঘরের ভিতর আগুন জ্বলে উঠেছে। নাস্তিক আস্তিক, আমরা কেউই পর্যাপ্ত কারণের নীতি অস্বীকার করি না। এমনকি বিজ্ঞানীরাও পপ থিওরি” (Pop Theory) তে বিশ্বাস করে নাঃ যে মহাবিশ্বের সবকিছুই কোন কারণ ছাড়াই অস্তিত্বে এসেছে। মহাবিশ্ব কেনই বা অস্তিত্বে এসেছে, বিজ্ঞানের যুক্তিবাদী দৃষ্টিতে আমরা কখনই এর কারণ খুঁজে পাব না, তবে এ কথাও বিজ্ঞান বলে যে, অস্তিত্বে থাকা সবকিছুর জন্য অবশ্যই একটি কারণ থাকতে হবে।

 

প্রথম কারণের যুক্তি অনুযায়ী, সমগ্র মহাবিশ্ব হলো অস্তিত্ব লাভকারী বিভিন্ন বিষয়ের এক বিশাল ও পরস্পর-সংযুক্ত এক শিকলের মতো। তাই এগুলোর প্রতিটিরই কোনো না কোনো কারণ থাকা আবশ্যক। যেমন, আমার অস্তিত্বের কারণ আমার বাবা-মা, তাঁদের অস্তিত্বের  কারণ তাঁদের বাবা-মা—এভাবেই পুরো বিষয়টি চলে আসছে। কিন্তু বিষয়টি এত সরল নয়। বিগ ব্যাং (মহাজাগতিক বিস্ফোরণ) থেকে শুরু করে গ্যালাক্সিগুলোর শীতল হওয়া, প্রোটিন অণুর বিবর্তন এবং আমার পূর্বপুরুষদের বিবাহ—এমন কোটি কোটি কারণের সমষ্টি না হলে আমার অস্তিত্ব থাকত না।

 

মহাবিশ্ব হলো কারণের এক বিশাল ও জটিল শৃঙ্খল। কিন্তু সামগ্রিকভাবে মহাবিশ্বের কি কোনো কারণ আছে? কারণের এই পুরো শৃঙ্খলটির কি কোনো “প্রথম কারণ (First Cause) আছে—এমন কোনো কারণ যার নিজস্ব কোনো কারণ নেই এবং যা সবকিছুর ঊর্ধ্বে বা স্বতন্ত্র? যদি তা না থাকে, তবে কারণের এক অন্তহীন ধারা বা অসীম পশ্চাদগমন’ (Infinite Regress) বিদ্যমান থাকে, যেখানে মহাজাগতিক শৃঙ্খলটির কোনো আদি বা প্রথম সংযোগস্থল নেই।

 

আর যদি তা থাকে, তবে এমন এক সত্তার অস্তিত্ব স্বীকার করতে হয় যিনি শাশ্বত, আবশ্যিক, স্বাধীন ও স্বয়ংব্যাখ্যাত; যার ঊর্ধ্বে বা পূর্বে অন্য কিছুর অস্তিত্ব নেই এবং যিনি অন্য কিছুর ওপর নির্ভরশীল নন। তাঁকে নিজের অস্তিত্বের পাশাপাশি অন্য সবকিছুরও ব্যাখ্যা দিতে হবে; কারণ, নিজের ব্যাখ্যা বা কারণ হিসেবে যদি তাঁর অন্য কিছুর প্রয়োজন হতো, তবে তিনি আর “প্রথম ও অকারণ সত্তা হিসেবে গণ্য হতেন না। স্বাভাবিকভাবেই, এমন সত্তা হলেন ঈশ্বর। আমরা যদি এমন কোনো আদি কারণের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে পারি, তবে আমরা ঈশ্বরের অস্তিত্বও প্রমাণ করতে পারব।



কিন্তু কেন এমনটা হওয়া প্রয়োজন?


প্রশ্ন হল, কেন একটি প্রথম কারণ” (First Cause) থাকতেই হবে? কারণ তা না থাকলে সমগ্র মহাবিশ্বই ব্যাখ্যাতীত থেকে যায় এবং সবকিছুর জন্য প্রযোজ্য পর্যাপ্ত কারণের নীতি (Principle of Sufficient Reason) লঙ্ঘিত হয়। যদি কোনো প্রথম কারণ না থাকে, তবে মহাবিশ্বের প্রতিটি বিষয়কে হয়তো তাৎক্ষণিক বা নিকটবর্তী কোনো কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়, কিন্তু চূড়ান্ত বা সামগ্রিক অর্থে কোনো কিছুরই ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না; ফলে পুরো মহাবিশ্বটাই ব্যাখ্যাহীন থেকে যায়। তখন প্রতিটি সত্তা বা বিষয় যেন একে একে বলে ওঠে, চূড়ান্ত ব্যাখ্যার জন্য আমার দিকে তাকাবেন না। আমি কেবল একটি মাধ্যম মাত্র; অন্য কোনো কিছুর কারণেই আমার অস্তিত্ব। পরিস্থিতি যদি কেবল এমনই হয়, তবে দায় বা কারণের ভার এক স্তর থেকে অন্য স্তরে কেবল স্থানান্তরিতই হতে থাকবে, যার কোনো শেষ নেই। আর ঈশ্বরই হলেন সেই সত্তা যিনি ঘোষণা করেন, দায়িত্ব বা কারণের এই ক্রম আমার কাছে এসে থামে।

 

যদি কোনো ‘প্রথম কারণ (First Cause) না থাকে, তবে মহাবিশ্ব হলো অনেকগুলো আংটার সমন্বয়ে গঠিত এক বিশাল শিকলের মতো; যেখানে প্রতিটি আংটা তার ঠিক উপরের আংটা দিয়ে ধরে রাখা হয়েছে, কিন্তু পুরো শিকলটি ধরে রাখার মতো কোনো কিছুই নেই। প্রথম কারণ না থাকলে মহাবিশ্ব অনেকটা ইঞ্জিনবিহীন চলমান ট্রেনের মতো হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিটি বগির গতি ব্যাখ্যা করা যায় তার ঠিক সামনের বগির গতির মাধ্যমে—যেমন, শেষ বগিটি চলে কারণ তার সামনের বগিটি তাকে টানে, আবার সেই বগিটি চলে কারণ তার সামনের বগিটি তাকে টানে, এবং এভাবেই প্রক্রিয়াটি চলতে থাকে। কিন্তু পুরো ট্রেন ও তার প্রথম বগিটিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার মতো কোনো ইঞ্জিনই সেখানে থাকে না। বিষয়টি নিঃসন্দেহে অসম্ভব। তাই প্রথম কারণ না থাকলে মহাবিশ্বের অবস্থাও ঠিক তেমনই—অর্থাৎ অসম্ভব।

 

কটি উপমা দেওয়া যাক। ধরুন, আমি আপনাকে বললাম এমন একটি বই আছে যাতে আপনি যা কিছু জানতে চান তার সবকিছুর ব্যাখ্যা রয়েছে। আপনি বইটি পাওয়ার জন্য অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে উঠলেন। আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন বইটি আমার কাছে আছে কি না। আমি বললাম না, আমাকে এটি আমার স্ত্রীর কাছ থেকে চাইতে হবে। তার কাছে কি বইটি আছে? না, তাকে এটি একজন প্রতিবেশীর কাছ থেকে নিতে হবে। সেই প্রতিবেশীর কাছে কি আছে? না, তাকে এটি তার শিক্ষকের কাছ থেকে নিতে হবে, আর সেই শিক্ষককে আবার... ইত্যাদি, ইত্যাদি—এভাবে চলতেই থাকলো। আসলে কারও কাছেই বইটি নেই। সেক্ষেত্রে, আপনি বইটি কখনোই পাবেন না। বই আদান-প্রদানকারীদের এই শৃঙ্খল বা ক্রমটি যতই দীর্ঘ বা সংক্ষিপ্ত হোক না কেন, আপনি বইটি কেবল তখনই পাবেন যদি কারও কাছে সেটি প্রকৃতপক্ষে থাকে এবং তাকে সেটি অন্য কারও কাছ থেকে ধার করতে না হয়। ঠিক তেমনই হলো অস্তিত্বের বিষয়টি।

 

অস্তিত্ব এক কারণ থেকে অন্য কারণে—অর্থাৎ কারণ থেকে কার্যের ধারায়—হস্তান্তরিত হয়। যদি কোনো প্রথম কারণ’ (First Cause) না থাকে—অর্থাৎ এমন কোনো সত্তা না থাকে যিনি শাশ্বত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ, যার অস্তিত্ব নিজস্ব সত্তাগত এবং যাকে অন্য কারও কাছ থেকে তা ধার করতে হয় না—তবে অস্তিত্বের সেই উপহার কখনোই এই ধারায় অন্যদের কাছে পৌঁছাতে পারবে না এবং কেউই তা পাবে না। কিন্তু আমরা তো তা পেয়েছি। আমাদের অস্তিত্ব আছে। আমরা আমাদের কারণসমূহের কাছ থেকে—সেই ক্রমধারা বেয়ে—অস্তিত্বের এই উপহার পেয়েছি; আর মহাবিশ্বের প্রতিটি প্রকৃত সত্তাও—পরমাণু থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ স্বর্গদূত পর্যন্ত—একইভাবে তা পেয়েছে। সুতরাং, অস্তিত্বের অবশ্যই একটি আদি কারণ বা উৎস থাকতে হবে—যিনি হলেন ঈশ্বর।

 

এই বিষয়টিকে বিমূর্ত দার্শনিক পরিভাষা যুক্তি দিয়ে এভাবে সাজানো যায়। অস্তিত্বশীল প্রতিটি সত্তা হয় নিজের কারণেই, অর্থাৎ নিজস্ব সত্তা বা স্বভাববশেই বিদ্যমান থাকে, অথবা তা নিজের কারণে বিদ্যমান থাকে না। যদি কোনো সত্তা নিজস্ব স্বভাববশেই বিদ্যমান থাকে, তবে তার অস্তিত্ব অনিবার্য ও শাশ্বত এবং সে নিজেই নিজের অস্তিত্বের ব্যাখ্যা। তার অস্তিত্বহীন হওয়া অসম্ভব; ঠিক যেমন ত্রিভুজের তিনটি বাহু না থাকাটা অসম্ভব। অন্যদিকে, যদি কোনো সত্তা বিদ্যমান থাকে কিন্তু তা নিজস্ব স্বভাববশত না হয়, তবে তার অস্তিত্বের জন্য বাইরের কোনো কারণ প্রয়োজন পড়ে। যেহেতু সে নিজেই নিজের অস্তিত্বের ব্যাখ্যা নয়, তাই অন্য কোনো কিছুর মাধ্যমেই তার ব্যাখ্যা পাওয়া সম্ভব। যেসব সত্তার নিজস্ব স্বভাবের মধ্যে তাদের অস্তিত্বের কারণ নিহিত থাকে না—অর্থাৎ যাদের অস্তিত্বের জন্য অন্য কারণের প্রয়োজন হয়—তাদের বলা হয় আকস্মিক’ (Contingent) বা নির্ভরশীলসত্তা। আর যে সত্তার স্বভাবই হলো অস্তিত্বশীল থাকা, তাকে বলা হয় অনিবার্য’ (Necessary) সত্তা।

 

এখন সত্যিটা হল, মহাবিশ্বে কেবল নির্ভরশীল সত্তারাই বিদ্যমান। ঈশ্বরই হতেন একমাত্র অনিবার্য সত্তা—যদি ঈশ্বরের অস্তিত্ব থাকত। সত্যিই কি তাঁর অস্তিত্ব আছে? কোনো অনিবার্য সত্তার কি অস্তিত্ব আছে? এর প্রমাণটি হলো নিম্নরূপঃ নির্ভরশীল সত্তারা নিজেদের অস্তিত্বের কারণ নিজেরাই হতে পারে না; তারা বাহ্যিক কারণের ওপর নির্ভরশীল। যদি কোনো স্বাধীন বা স্বয়ম্ভূ সত্তা না থাকত, তবে নির্ভরশীল সত্তাদের পুরো শৃঙ্খলটি বাহ্যিক কোনো কিছুর ওপর নির্ভর করত না এবং তাদের অস্তিত্বও থাকত না। কিন্তু বাস্তবে তাদের অস্তিত্ব রয়েছে। সুতরাং, একটি স্বাধীন সত্তার অস্তিত্ব অবশ্যই আছে।


সাধু থমাসের ‘প্রথম কারণের’ চারটি মৌলিক যুক্তি


প্রথমঃ তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে, গতিশীল বস্তুসমূহের শৃঙ্খলে অবশ্যই একটি প্রথম গতিশীল কিছু থাকতে হবে, কারণ কোনো কিছুই নিজে নিজে চলতে পারে না। (এখানে চলাবলতে যেকোনো ধরনের পরিবর্তনকে বোঝানো হয়েছে, শুধু স্থানের পরিবর্তনকে নয়) যদি গতিশীল বস্তুসমূহের সমগ্র শৃঙ্খলে কোনো প্রথম গতিশীল কিছু না থাকত, তবে তা এখন যেভাবে চলছে সেভাবে চলতে পারত না। যদি প্রথম গতিশীল কোনো কিছু ছাড়া গতিশীল বস্তুসমূহের একটি অসীম পশ্চাদপসরণ থাকত, তবে কোনো গতিই কখনো শুরু হতে পারত না, এবং যদি তা কখনো শুরুই না হতো, তবে তা চলতে এবং এখন বিদ্যমান থাকতে পারত না। কিন্তু তা চলছে, তা এখন বিদ্যমান। সুতরাং তা শুরু হয়েছিল, এবং সুতরাং একটি প্রথম গতিশীল কিছু নিশ্চয়ই আছে।

 

দ্বিতীয়ঃ এখানে তিনি তাঁর যুক্তিটিকে গতির কারণ প্রমাণের পর্যায় থেকে অস্তিত্বের কারণ—বা ‘কার্যকরী কারণ’ (Efficient Cause)—প্রমাণের পর্যায়ে উন্নীত করেন। তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে, যদি কোনো ‘প্রথম কার্যকরী কারণ’ বা মহাবিশ্বের উৎপত্তির মূল কারণ না থাকত, তবে কোনো ‘দ্বিতীয় কারণ’-এর অস্তিত্বও সম্ভব হতো না; কারণ দ্বিতীয় কারণগুলো (অর্থাৎ, যেসব কারণ অন্য কোনো কারণ দ্বারা সৃষ্ট) একটি প্রথম কারণের (অর্থাৎ, এমন এক কারণ যা অন্য কোনো কিছুর দ্বারা সৃষ্ট নয়) ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু আমাদের চারপাশে এমন অনেক দ্বিতীয় কারণ বিদ্যমান। সুতরাং, অবশ্যই একটি ‘প্রথম কারণ’ রয়েছে।

 

তৃতীয়ঃ এখানে তিনি যুক্তি দেন যে, যদি এমন কোনো সত্তা না থাকত যিনি শাশ্বত, অপরিহার্য এবং অবিনশ্বর; যদি সবকিছুরই অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ার বা বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকত, তবে শেষ পর্যন্ত সবকিছুর ক্ষেত্রেই সেই বিলুপ্তির সম্ভাবনাটি বাস্তবে পরিণত হতো। অন্য কথায়, যদি সবকিছুই ধ্বংসশীল হতো, তবে অসীম সময়ের ব্যবধানে সবকিছুই একসময় ধ্বংস হয়ে যেত। কিন্তু সেক্ষেত্রে নতুন করে আর কিছুরই উদ্ভব সম্ভব হতো না। তখন সর্বত্র কেবল মৃত্যু ও শূন্যতাই বিরাজ করত; কারণ কোনো সত্তা একবার অস্তিত্বহীন হয়ে পড়লে সে নিজে বা অন্য কোনো কিছুর অস্তিত্ব পুনরায় শুরু করার কারণ হতে পারে না। আর যদি ঈশ্বরের অস্তিত্ব না থাকে, তবে ধরে নিতে হয় যে অসীম সময় ধরে মহাবিশ্বের অস্তিত্ব ছিল—যার কোনো শুরু বা আদি কারণ নেই। কিন্তু বাস্তবে তো এমন সর্বব্যাপী মৃত্যু ঘটেনি; বরং সবকিছুর অস্তিত্ব এখনো বিদ্যমান! সুতরাং, এমন এক অপরিহার্য সত্তার অস্তিত্ব অবশ্যই থাকতে হবে যা কখনোই অস্তিত্বহীন হতে পারে না বা যার বিলুপ্তি কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আর ঈশ্বর হলেন ঠিক এমনই এক সত্তা।

 

চতুর্থঃ পূর্ণতা, মঙ্গল কিংবা মূল্যেরও একটি প্রথম কারণ বা উৎস থাকা আবশ্যক। আমরা বিভিন্ন বিষয়কে কম-বেশি পূর্ণাঙ্গ, ভালো বা মূল্যবান হিসেবে বিচার করে থাকি। যদি এই বিচারটি মিথ্যা ও অর্থহীন না হয়—অর্থাৎ শামুক তুলনায় মানুষের আত্মার মধ্যে যদি সত্যিই অধিকতর পূর্ণতা বিদ্যমান থাকে—তবে এই ক্রমবিন্যাস বা স্তরভেদ সম্ভব করার জন্য পূর্ণতার একটি প্রকৃত মানদণ্ড থাকা জরুরি; কারণ পূর্ণতার ক্রমতালিকায় কোনো বস্তুকে তখনই উচ্চতর স্থান দেওয়া হয়, যখন সেটি সেই মানদণ্ড, আদর্শ বা পরম পূর্ণতার অধিকতর নিকটবর্তী হয়। পূর্ণতার সেই প্রকৃত মানদণ্ড হিসেবে যদি কোনো পরম পূর্ণ সত্তার অস্তিত্ব না থাকে, তবে আমাদের যাবতীয় মূল্য-বিচার অর্থহীন ও অসম্ভব হয়ে পড়ে। পূর্ণতার সেই প্রকৃত আদর্শ মানদণ্ড বা পরম পূর্ণ সত্তাই হলো ঈশ্বরেরই অপর এক পরিচয়।

 

এই চারটি যৌক্তিক প্রমাণের একটি সাধারণ যৌক্তিক কাঠামো রয়েছে। তা ঈশ্বরের অস্তিত্ব সরাসরি প্রমাণ করার পরিবর্তে, এগুলো নাস্তিকতাকে খণ্ডন করার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে তাঁর অস্তিত্ব প্রমাণ করে। হয় কোনো ‘প্রথম কারণ’ (First Cause) আছে, অথবা নেই—এই দুটি সম্ভাবনাই পড়ে থাকে। তাই প্রমাণগুলো নেই’—এই সম্ভাবনাটিকে বিবেচনা করে তা খণ্ডন করে দেয়; ফলে একমাত্র অবশিষ্ট সম্ভাবনাটিই পড়ে থাকে—আর তা হলো ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে। তা জানা যাক।

 

চারটি ভিন্ন ধরনের কারণের ক্ষেত্রে এই চারটি যুক্তিই একই মূল কথা বলেঃ প্রথমত, গতির কারণ; দ্বিতীয়ত, অস্তিত্বের সূচনার কারণ; তৃতীয়ত, বর্তমান অস্তিত্বের কারণ; এবং চতুর্থত, মঙ্গল বা গুণমানের কারণ। এদের সাধারণ বিষয়টি হলো—যদি কোনো ‘প্রথম কারণ’ (First Cause) না থাকে, তবে কোনো ‘দ্বিতীয় কারণ’ও থাকতে পারে না; অথচ বাস্তবে দ্বিতীয় কারণের অস্তিত্ব আছে। সুতরাং, গতি, সূচনা, অস্তিত্ব এবং পূর্ণতার অবশ্যই একটি প্রথম কারণ থাকতে হবে।

 

এমন অকাট্য যুক্তিজাল থেকে কেউ কীভাবে বেরিয়ে আসতে পারে? এখানে চারটি উপায় তুলে ধরা হলো, যার মাধ্যমে বিভিন্ন দার্শনিক তেমনটি করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন।

 

১) অনেকেই বলেন যে এই যুক্তিগুলো ঈশ্বরের অস্তিত্বকে প্রমাণ করে না, বরং কেবল কোনো অস্পষ্ট ‘প্রথম কারণবা অনুরূপ তেমন কিছুর অস্তিত্বই নির্দেশ করে। পাস্কাল—যিনি একজন খ্রীষ্টান হওয়া সত্ত্বেও ঈশ্বরের অস্তিত্বকে যৌক্তিকভাবে প্রমাণ করা সম্ভব বলে বিশ্বাস করতেন না । তিনি বলতেন যে, “আব্রাহাম, সাহাক ও যাকোবের ঈশ্বর; দার্শনিক ও পণ্ডিতদের ঈশ্বর নন। একথা সত্য যে, খ্রীষ্টানরা ঈশ্বরবলতে যা বোঝে, এই যুক্তিগুলো তার সবকিছু প্রমাণ করে না; তবে এগুলো এমন এক সত্তাকে প্রমাণ করে যিনি অতীন্দ্রিয়, শাশ্বত, অকারণজাত, অবিনশ্বর, স্বয়ম্ভু, স্বাধীন এবং সর্বগুণে পূর্ণ। অন্ততপক্ষে, এই যুক্তিগুলোতে ঈশ্বরের ধারণার একটি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ অংশই এতে উঠে আসে—যা কোনো নাস্তিকের পক্ষে হজম করা বেশ কঠিন।

 

২) হিউমের মতো কিছু দার্শনিক বলেন যে, কারণের ধারণাটি দ্ব্যর্থক(Ambiguous) এবং ভৌত জগতের বাইরে ঈশ্বরের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়। মেঘ বৃষ্টির উপর যা করে, বাবা-মা সন্তানের উপর যা করে, লেখক বইয়ের উপর যা করে এবং ঈশ্বর মহাবিশ্বের উপর যা করে—এই সবকিছুর জন্য আমরা একই পরিভাষা ব্যবহার করার সাহস কী করে পাই? এর উত্তর হলো, কারণের ধারণাটি সাদৃশ্যমূলক—অর্থাৎ, এটি এক উদাহরণ থেকে অন্য উদাহরণে কিছুটা ভিন্ন হয়, কিন্তু পুরোপুরি নয়। মানুষের পিতৃত্ব ঐশ্বরিক পিতৃত্বের মতো, এবং ভৌত কার্যকারণ ঐশ্বরিক কার্যকারণের মতো। একজন লেখক যেভাবে তার মনে একটি বইয়ের ধারণা তৈরি করেন, তা ঠিক একজন নারী যেভাবে তার গর্ভে একটি শিশুর জন্ম দেন, তার মতোও নয়, কিন্তু আমরা উভয়কেই কারণ বলি। এই আপত্তিটি সঠিক যে, আমরা পুরোপুরি বুঝি না ঈশ্বর কীভাবে মহাবিশ্বের কারণ হন, যেমনটা আমরা বুঝি বাবা-মা কীভাবে সন্তানের কারণ হন বা মেঘ কীভাবে বৃষ্টির কারণ হয়। কিন্তু তবুও পরিভাষাটি অর্থবহ থেকে যায়। একটি কার্যের জন্য কারণ হলো অপরিহার্য শর্ত: কারণ না থাকলে কার্যও নেই। স্রষ্টা না থাকলে সৃষ্টিও নেই; ঈশ্বর না থাকলে মহাবিশ্বও নেই।

 

৩) অনেকে আবার কখনও কখনও এমন যুক্তিও দিয়েছেন যে, এই যুক্তিটির মধ্যে একটি স্ববিরোধিতা আছে। কারণ এই যুক্তির একটি ভিত্তি হলো যে সবকিছুরই একটি কারণ থাকা প্রয়োজন, অথচ এর সর্বশেষ সিদ্ধান্তটি হলো এমন কিছুর (ঈশ্বরের) অস্তিত্ব আছেই যার নিজের কোনো কারণের প্রয়োজন নেই। যে শিশুটি প্রশ্ন করে ঈশ্বরকে কে সৃষ্টি করেছেন?”, সে আসলে এই আপত্তির কথাই ভাবছে। এর উত্তরটি খুবই সহজ: এই যুক্তিতে সবকিছুরই একটি কারণ প্রয়োজন—এমন কোনো ভিত্তি ব্যবহার করা হয়নি। বরং এখানে বলা হয়েছে, গতিশীল সবকিছুরই একটি কারণ প্রয়োজন, নির্ভরশীল সবকিছুরই একটি কারণ প্রয়োজন এবং অপূর্ণ সবকিছুরই একটি কারণ প্রয়োজন।

 

৪) অনেকে আবার এ প্রশ্নও করেছেন, কেন এমন কোনো অসীম ক্রম বা ধারা (Infinite Regress) থাকতে পারে না যার কোনো আদি সত্তা বা সূচনা নেই? গণিতের ক্ষেত্রে অসীম ক্রম বা ধারা সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য বিষয়ঃ ধনাত্মক সংখ্যার মতোই ঋণাত্মক সংখ্যাও অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। তাহলে সময়ের ক্ষেত্রে কেন এমনটা হতে পারবে না—যেখানে সংখ্যার ধারার মতোই কোনো সর্বোচ্চ বা চূড়ান্ত সীমা থাকবে না, তা ঋণাত্মক দিকের ক্ষেত্রে হোক (অর্থাৎ অতীতের কোনো সূচনা নেই) কিংবা ধনাত্মক দিকের ক্ষেত্রে (অর্থাৎ ভবিষ্যতের কোনো শেষ নেই)? এর উত্তর হলো, বাস্তব সত্তা বা মানুষ বা অন্যান্য প্রাণী বা অস্তিত্বশীল বিষয়গুলো সংখ্যার মতো নয়; এদের ক্ষেত্রে কার্যকারণ সম্পর্কের প্রয়োজন হয়। কারণ, বাস্তব সত্তার এই ক্রমধারা কেবল একমুখী—অতীত থেকে ভবিষ্যতের দিকে—এবং ভবিষ্যৎ অতীতের কারণেই সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে, ধনাত্মক সংখ্যাগুলো ঋণাত্মক সংখ্যার কারণে সৃষ্ট হয় না। বস্তুত, সংখ্যার ধারার মধ্যেও ‘আদি কারণ’ বা ‘প্রথম কারণ’-এর একটি সমতুল্য বিষয় রয়েছে, আর তা হলো ‘এক’ (১) সংখ্যাটি। যদি কোনো প্রথম ধনাত্মক পূর্ণসংখ্যা বা একক ‘এক’ না থাকত, তবে এরপর আর কোনো একক যোগ করা সম্ভব হতো না। ‘দুই’ মানে হলো দুটি ‘এক’-এর সমষ্টি, ‘তিন’ মানে তিনটি ‘এক’-এর সমষ্টি—এভাবেই ক্রমটি এগিয়ে চলে। অর্থাৎ, যদি কোনো ‘প্রথম’ না থাকত, তবে ‘দ্বিতীয়’ বা ‘তৃতীয়’-এর অস্তিত্বও থাকা সম্ভব হতো না।


ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য, আপনার কাছে “প্রথম কারণের এই যুক্তিটি যদি খুব বেশি জটিল মনে হয়, তবে একেবারে শুরুতে আমরা যে স্বজ্ঞাত ধারণাটি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছিলাম—সেখানে ফিরে যাওয়াই শ্রেয়। আমি জানি, ‘প্রথম কারণ’ (First Cause) সংক্রান্ত যুক্তির সমস্ত বিমূর্ত খুঁটিনাটি হয়তো সবার পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়, কিন্তু এর মূল বিষয়টি যে কেউ বুঝতে পারেন; যেমনটি সি. এস. লুইস বলেছিলেন, আমি আমার অস্তিত্বের গভীরে অনুভব করতাম যে, এই মহাবিশ্ব নিজের ব্যাখ্যা নিজেই দিতে পারে না।