গোমাংস না খেলে ভাল হিন্দু হওয়া যেত নাঃ স্বামী বিবেকানন্দ
ভারতে প্রায়দিনই গোমাংস খাওয়া, গোমাংস বিক্রি ও গোহত্যা করার অভিযোগে,
“গোরক্ষক দলের” লোকজন বিশেষ সম্প্রদায়ের কিছু মানুষকে মারধর ও হত্যা করে থাকে। এই অমানবিক
ঘটনা ভারতে বহুকাল থেকে চলে আসছে। উইকিপিডিয়াতে এই ঘটনাগুলি উল্লেখ করে একটা তালিকা
প্রকাশ করা হয়েছে, যেটা আপনি পড়তে পারেন। [১] যে কেউই ভারতের মাটিতে জন্মেছে তারা সকলেই
এ বিষয় নিয়ে ভাল ভাবেই অবগত যে, হিন্দুদের কাছে, গরু হল মাতৃতুল্য। তাদের এই বিশ্বাস
থেকেই হিন্দুরা সেই সকল মানুষকে পাপী বলে গণ্য করে থাকে, যারা গোমাংস খেয়ে থাকে বা
গোহত্যার করে থাকে। কিন্তু মজার বিষয় হল, ২০২৫-২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক তথ্য অনুযায়ী,
ভারত এখন বিশ্বের দ্বিতীয় ও তৃতীয় বৃহত্তম গরুর মাংস রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে স্থান
পেয়েছে, যার বার্ষিক রপ্তানি মূল্য ৩৪,১৭৭ কোটি টাকারও বেশি। ভারত বিশ্ব বাজারে ব্রাজিল,
অস্ট্রেলিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে প্রতিযোগিতা করে, দক্ষিণ-পূর্ব
এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার মতো অঞ্চলে সরবরাহ করে। উত্তরপ্রদেশ ভারতের বৃহত্তম
গোমাংস রপ্তানিকারক রাজ্য, যা ভারতের মোট গোমাংস রপ্তানির প্রায় ৬০% এ অবদান রাখে।
[২] [৩] গোমাংস রপ্তানি করে প্রতি বছর ভারত সরকার প্রায় ৩৫,০০০ – ৪০,০০০ কোটি টাকারও
বেশি বৈদিশিক মুদ্রা আয় করে। অবশ্য এ ব্যাপারে “গোরক্ষক দলের” লোকজন মুখ বন্ধ করে রাখবে
বলেই সিধান্ত নিয়েছে। আপনি যদি বুঝদার মানুষ হয়ে থাকেন, তবে সেই কারণটা আপনার জানারই
কথা। কিন্তু প্রশ্ন হল, হিন্দু শাস্ত্রে ও হিন্দু ধর্মের ইতিহাসে গোমাংস খাওয়া কি সত্যি
নিষিদ্ধ ছিল? বাস্তব কিন্তু বিপরীত সাক্ষ্য দিচ্ছে!
![]() |
| ছবিঃ স্টাটিস্টা |
অনেকেই এ কথা জানেন না যে, হিন্দু ধর্মের অনেক শাস্ত্রগ্রন্থেই গরু
বলি ও গোমাংস খাওয়ার কথা উল্লেখ আছে। যদিও জেদ ও অজ্ঞতার বশে অধিকাংশ ধর্মপ্রাণ হিন্দুরা
তা মানতে চান না। অবশ্য এটাও একটা কথা যে, হিন্দুরা নিজেদের ধর্মীয় শাস্ত্রগ্রন্থগুলি
আদৌ কোনদিন খুলে দেখে না। “বিবেকানন্দের
বাণী ও রচনা” গ্রন্থে, স্বামী বিবেকানন্দ নিজেই গোমাংস খাওয়ার ব্যাপারে
অনেক কিছু বলে গেছেন। প্রাচীন হিন্দুরা যে গোমাংস খেত তাঁর কথায় তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সত্য জানতে হলে সকল ধর্মপ্রাণ হিন্দুদের গোমাংস সম্বন্ধে বিবেকানন্দের বক্তব্যগুলো
জানা উচিত। নিচে তার উক্তিগুলো উৎস সমেত উল্লেখ করা হল।
“If we did not eat beef
and mutton, there would be no butchers. Eating meat is only allowable for
people who do very hard work, and who are not going to be Bhaktas; but if you
are going to be Bhaktas, you should avoid meat.”
অনুবাদঃ আমরা যদি গোমাংস এবং মেষের মাংস না খেতাম তাহলে
কোনো কসাই থাকতো না। যারা অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রমী এবং যারা ভক্ত হবেন না একমাত্র তাদের
ক্ষেত্রে মাংস খাওয়া গ্রহণযোগ্য কিন্তু আপনি যদি ভক্তি হতে চলেন তবে আপনার মাংস
পরিত্যাগ করা উচিত।
দেখুনঃ (The Complete Works of Swami Vivekananda/Volume 4/Addresses on
Bhakti Yoga/The_Preparation)
Every man, in every age, in every country is under
peculiar circumstances. If the circumstances change, ideas also must change. Beef-eating
was once moral. The climate was cold, and the cereals were not much
known. Meat was the chief food available. So in that age and clime, beef was in
a manner indispensable. But beef-eating is held to be immoral now.
অনুবাদঃ সকল যুগের সকল দেশের সকল মানুষ অদ্ভুত পরিস্থিতির
মধ্য দিয়ে যায়। পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে ধারণারও পরিবর্তন হওয়া উচিত। গোমাংস
খাওয়া একসময় নৈতিক ছিল। জলবায়ু শীতল ছিল, খাদ্যশস্য খুব একটা পরিচিত ছিল না। মাংসই
প্রধান সুলভ খাদ্য ছিল। সুতরাং সেই যুগে এবং আবহাওয়ায় গোমাংস খাওয়া একরকম
অপরিহার্য ছিল। কিন্তু গোমাংস খাওয়া এখন অনৈতিক।
“সত্য বটে , বহু বাক্য এক আধটির দ্বারা নিহত হওয়া অন্যায্য। তাহা হইলে
চিরপ্রচলিত মধুপর্কাদি প্রথা (১) ‘অশ্বমেধং গবালম্ভং সন্ন্যাসং পলপৈতৃকম’ ইত্যাদি
(২) দুই একটি বাক্যের দ্বারা কেন নিহত হইল ? বেদ যদি নিত্য হয় , তবে ইহা দ্বাপরের
, ইহা কলির ধর্ম ইত্যাদি বচনের অর্থ এবং সাফল্য কি?”
(১) মধুপর্ক বৈদিক প্রথা- ইহাতে গোবধের প্রয়োজন হইত।
(২) অশ্বমেধং গবালম্ভং সন্ন্যাসং পলপৈতৃকম।
দেবরেণ সুতোৎপত্তিং কলৌ পঞ্চ বিবর্জয়েৎ।।
অশ্বমেধ, গোবধ, সন্ন্যাস , শ্রাদ্ধে মাংসভোজন এবং দেবর দ্বারা পুত্রোৎপাদন
– কলিকালে এই পাঁচটি ক্রিয়া বর্জন করিবে।
(বাণী ও রচনা, ৬ ষ্ঠ খণ্ড/ ১৭ ই আগস্ট, ১৮৮৯ এ প্রমদাবাবুকে লিখিত পত্র)
The Brahmins at one time ate beef
and married Sudras. (A) calf was killed to please a guest. Sudras cooked for
Brahmins.
অনুবাদঃ ব্রাহ্মণেরা একসময় গোমাংস খেতেন এবং শূদ্রাকে
বিয়ে করতেন। অতিথির সন্তুষ্টির জন্য একটি গোবৎসকে হত্যা করা হত। শূদ্রেরা ব্রাহ্মণদের
জন্য রান্না করতো।
There was a time in this very India
when, without eating beef, no Brahmin could remain a Brahmin;
you read in the Vedas how, when a Sannyasin, a king, or a great man came into a
house, the best bullock was killed; how in time it was found that as we were an
agricultural race, killing the best bulls meant annihilation of the race.
Therefore the practice was stopped, and a voice was raised against the killing
of cows.
অনুবাদঃ একসময় এই ভারতে গরু না খেলে কোনো ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণ
থাকতে পারতেন না। আপনি বেদে পড়তে পারেন, কোনো বাড়িতে সন্ন্যাসী, রাজা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ
লোক এলে সবচাইতে ভালো বৃষকে হত্যা করা হত। ধীরে ধীরে সকলে বুঝলেন যেহেতু আমরা
কৃষিজীবি জাতি , তাই সেরা সেরা বৃষ হত্যা করা মানে জাতির বিনাশ করা। তাই এই প্রথা বন্ধ
হয়ে যায় এবং গোহত্যার বিরুদ্ধে আওয়াজ ওঠে।
You will be astonished if I tell you
that, according to the old ceremonials, he is not a good Hindu who does not eat
beef. On certain occasions he must sacrifice a bull and
eat it. That is disgusting now.
অনুবাদঃ আপনারা আশ্চর্যান্বিত হবেন, যদি আমি আপনাদের
বলি প্রাচীন রীতি অনুযায়ী গরু না খেলে ভালো হিন্দু হওয়া যেত না। বিশেষ অনুষ্ঠানে
তার অবশ্যই বৃষ বলি দিয়ে খেতে হত। এটা এখন অত্যন্ত বিরক্তিকর।
দেখুনঃ (The Complete Works of Swami Vivekananda/Volume
3/Buddhistic_India)
এই নিয়ে আরও তথ্যবহুল প্রবন্ধ লেখা যায়, কিন্তু এখানে যে যৎসামান্য
তথ্য দেওয়া হল, এর মূল উদ্দেশ্য পাঠকের কাছে এটা স্পষ্ট করে দেওয়া, একসময় হিন্দুরা
গোমাংস খেত ও গোহত্যা করত এবং তারা সে সময় গরুকে কখনই মা বলে মনে করত না। প্রাচীন হিন্দু
সমাজে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে গোমাংস রান্না করা হত এই বিষয়ে ভারতের ইতিহাসবিদরাও
জানিয়েছেন। জানতে ইচ্ছা হয়, বর্তমান হিন্দুদের গরু নামক এই প্রাণীর প্রতি এত ধর্মীয়
আবেগ, ভক্তি ও ভালবাসা কেন? ভারতের ইতিহাসবিদরা মনে করেন, এর পিছনে রয়েছে রাজনৈতিক
উদ্দেশ্য ও হিন্দু সমাজে ব্রাহ্মন্যবাদের আধিপত্য বিস্তারের সুক্ষ পরিকল্পনা।
“বিবেকানন্দের
বাণী ও রচনা” গ্রন্থগুলি পিডিএফে ডাউনলোড করে উল্লিখিত তথ্য মিলিয়ে নিতে
পারেন -
বাণী ও রচনা বাংলায় - প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় , চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম, নবম, দশম খণ্ড।
তথ্যসূত্রঃ
১. https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_incidents_of_cow_vigilante_violence_in_India#Statistics
৩. https://thewire.in/trade/who-are-the-biggest-exporters-of-beef-in-the-world

