ঈশ্বর একজনই আছেন!
ভূমিকা
পবিত্র বাইবেল ঈশ্বরের অনুপ্রেরণায় রচিত এক গ্রন্থ। এই গ্রন্থটি প্রাচীন। পবিত্র এই গ্রন্থ কখনও পরিবর্তন হয়নি, আদৌ কোনও দিনও এর মধ্যে পরিবর্তন আসবে না। এর সংরক্ষক হলেন স্বয়ং প্রভু। এই পবিত্র বাইবেল আমাদের কাছে এই সাক্ষ্য দেয় যে, ঈশ্বর একজনই আছেন! পৃথিবীতে যে সকল প্রাচীন গ্রন্থগুলি পাওয়া যায়, তার মধ্যে বাইবেল হল অন্যতম, সেরা এবং আশ্চর্যজনক! ইতিহাসবিদরা বলেন, সারা বিশ্বে যদি এমন কোনও গ্রন্থ পাওয়া যায়, যা এই সাক্ষ্য দেয় যে, “ঈশ্বর একজনই!”, তাদের মধ্যে বাইবেলই হল সর্বপ্রথম ও প্রাচীন গ্রন্থ যে এই চিরসত্য মানুষের কাছে প্রকাশ করেছে। বাইবেলের ছারাও, তার আগেও এমন অনেক প্রাচীন গ্রন্থ ও পুঁথিপত্রের হদিস মেলে যারা ঈশ্বরের অস্তিত্বের কথা বলে। কিন্তু সেই সব গ্রন্থের কোনটাই ধর্মতাত্ত্বিক ভাবে এ সাক্ষ্য দেয়না যে, “ঈশ্বর একজনই!”। ঈশ্বর যে এক ও অদ্বিতীয়, এই সত্য সম্পর্কে পবিত্র বাইবেলের কয়েকটি উদ্ধৃতি নিচে দেওয়া হল।
পবিত্র বাইবেলঃ পুরাতন নিয়ম
“সুতরাং আজ জেনে নাও, হৃদয়ে
এই কথা গেঁথে রাখ যে, ঊর্ধ্বে সেই স্বর্গে ও নিম্নে এই
মর্তে প্রভুই তো ঈশ্বর, অন্য কেউ নয়”। [দ্বিতীয় বিবরণ ৪:৩৯]
“শোন, ইস্রায়েল! প্রভু
যিনি, তিনিই আমাদের ঈশ্বর, অদ্বিতীয়ই
সেই প্রভু। তুমি তোমার পরমেশ্বর প্রভুকে তোমার সমস্ত হৃদয় দিয়ে, তোমার সমস্ত প্রাণ দিয়ে, তোমার সমস্ত শক্তি
দিয়ে ভালবাসবে”। [দ্বিতীয় বিবরণ ৬:৪-৫]
“আমিই প্রভু, আর কেউ নয়;
আমি ছাড়া অন্য ঈশ্বর নেই। তুমি আমাকে না জানা সত্ত্বেও আমি
তোমাকে বলবান করব,” [ইসাইয়া ৪৫:৫]
“আমাদের সকলের কী এক পিতা নন? এক ঈশ্বর কী আমাদের সৃষ্টি করেননি? তবে আমরা কেন প্রত্যেকে একে অন্যের প্রতি অবিশ্বস্ততা দেখিয়ে আমাদের পিতৃপুরুষদের সন্ধি অপবিত্র করি?” [মালাখি ২:১০]
পবিত্র বাইবেলঃ নুতন নিয়ম
“তখন যীশু তাকে বললেন, ‘দূর
হও, শয়তান; কেননা লেখা আছে,
তোমার ঈশ্বর প্রভুকেই পূজা করবে, কেবল
তাঁরই সেবা করবে।’” [মথি ৪:১০]
“সেই শাস্ত্রী তাঁকে বললেন, ‘ঠিক কথা, গুরু, আপনি
যা বলেছেন তা সত্য: তিনি এক, এবং তিনি ছাড়া আর কোন ঈশ্বর
নেই”; [মার্ক ১২:৩২]
“ঈশ্বর এক, একথা তুমি তো
বিশ্বাস কর, তাই না? ভালই কর,
অপদূতেরাও তা বিশ্বাস করে, এমনকি ভয়ে
কাঁপে!” [যাকোব ২:১৯]
“মধ্যস্থ তো একজনের জন্য হয় না, অপরদিকে ঈশ্বর এক।” [গালাতীয় ৩:২০]
“কেননা ঈশ্বর এক, এবং ঈশ্বর ও মানুষদের মধ্যে মধ্যস্থ এক—তিনি সেই মানুষ যীশু খ্রীষ্ট!” [১ তিমথি ২:৫]
ঈশ্বরের একত্বের অর্থ – Defining
The ONENESS of God
ধর্মতাত্ত্বিক ভাবে এ কথা স্পষ্ট যে, ঈশ্বরের একত্ব (Oneness) আর মানুষের একত্ব পুরোপুরি আলাদা এক বিষয়। মানুষের একত্ব তাকে স্থান কাল ও জগতের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। তাই, একজনের মানুষের পক্ষে কখনই একই সময়ে দুটি ভিন্ন স্থানে উপস্থিত থাকাটা সম্ভব নয়। কিন্তু ঈশ্বর একই সময়ে স্বর্গে আর ওই একই সময়ে এই পৃথিবীতে উপস্থিত থাকতে পারেন। ঈশ্বরের পক্ষে এমনটা করা অসম্ভব নয়, আবার কঠিনও নয়। কিন্তু এ বক্তব্যের অর্থ এই নয় যে, ঈশ্বরের এক অংশ স্বর্গে এবং অপর অংশ পৃথিবীতে উপস্থিত আছে। আমাদের বক্তব্য হলো, ঈশ্বর তাঁর পূর্ণ মহিমা সহকারে, স্বর্গ ও পৃথিবী জুড়েই সমস্ত স্থানেই উপস্থিত আছেন। এই অবস্থাকে ধর্মতত্ত্বের ভাষায় – “Omnipresence”, বা “সর্বব্যাপীতা”, বলা হয়।
ঠিক এমনটাই ঘটেছিল, যখন প্রভু যীশু খ্রীষ্ট এই পৃথিবীতে এসেছিলেন। পবিত্র বাইবেলে বলা হয়েছেঃ “কেননা তাঁরই (খ্রীষ্টের) মধ্যে ঈশ্বরত্বের সমস্ত পূর্ণতা দেহগতরূপে বসবাস করে,” [ কলসিয় ২:৯] । একেই আমরা ধর্মতত্ত্বের ভাষায় “দেহ ধারণ” বা “Incarnation” বলে থাকি। আমরা এমন অনেক মহান ব্যাক্তিগণ ও রাজাদের কাহিনী শুনেছি, যারা দরিদ্রদের কাছে দরিদ্র সেজে তাদের গৃহ পরিদর্শন করতে যেতেন। সঙ্গে কোনও ভৃত্য নিতেন না। এমন কি তাদের মানানসই সেই রকমের যানবাহন চড়েও যেতেন না। তারা এমনটা করতেন, যাতে দরিদ্র মানুষগুলো ভয় না পায় বা কোনও সঙ্কোচবোধ না করে। তাদের অভাব-অনটন স্বচক্ষে দেখে সাহজ্য করার লক্ষ্যে ওই সকল ব্যাক্তিরা এমন ভাবে বেশভূষা ধারণ করতেন। আমরা এমন সব ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা করি এবং তাদের বিনয় ও মহত্ত্বের জন্য আমরা তাদের প্রশংসা করি। একজন ব্যক্তি যত বেশি মহান, তিনি নিজেকে ততই বিনম্র করে তোলেন। আর এর মধ্য দিয়ে তার মহত্ত্বও ততটাই বৃদ্ধি পায়।
কিন্তু সকলের চেয়ে মহান কে? তিনি কী সেই সর্বশক্তিমান ঈশ্বর নন? আর কে সর্বাধিক মহিমান্বিত? তিনি কী সেই ঈশ্বরই নন, যিনি এই মহাবিশ্বের সবকিছু সৃষ্টি করেছেন? সুতরাং সংক্ষেপে বলতে গেলে, আমরা নিশ্চিতরূপে এ কথা ঘোষণা করি, এবং ঈশ্বর নিজেও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ব্যক্ত করেন যে, “ঈশ্বর এক!” । কিন্তু ঈশ্বরের এই একত্ব মানুষের একত্বের সমতুল্য নয়; কারণ ঈশ্বর কোনো সীমার অধীন নন। আর ‘ঈশ্বরসত্তা’ প্রকৃতপক্ষে এমন কিছু, মানুষের বুদ্ধিমত্তা যার গভীরতা পরিমাপ করতে অক্ষম। তাই ঈশ্বর স্বয়ং নিজের সম্পর্কে যা কিছু প্রকাশ করেছেন, মানুষ যখন তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে, তখন ঈশ্বরের প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধামিশ্রিত বিস্ময়ে মানুষ অভিভূত হয়ে যায়।
ঈশ্বর আমাদের কাছে যা প্রকাশ করেছেন
বাস্তবে মানুষের পক্ষে ঈশ্বরের সম্বন্ধে প্রকৃত জ্ঞান
লাভ করা কখনই সম্ভব নয়, যদি স্বয়ং ঈশ্বর নিজেই মানুষের
কাছে সেই জ্ঞান প্রকাশ না করেন। বা যদি ঈশ্বর নিজেই মানুষের কাছে এসে ধরা না দেন।
মানুষের মন সসীম ও তার বোধগম্যতার একটি সীমা আছে। তাই ঈশ্বরের মতো একজন অসীম
সত্তার স্বরূপ অনুধাবন করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। সেই কারণেই এটা প্রয়োজনীয় ছিল
যে, ঈশ্বর ঐশ্বরিক প্রেরণায় লিখিত গ্রন্থ বাইবেলের
মাধ্যমে নিজেকে আমাদের কাছে প্রকাশ করবেন এবং সেই গ্রন্থের একটি শব্দ বা একটি
অক্ষরও পরিবর্তন করার যেকোনো প্রচেষ্টা থেকে তিনি সেটাকে রক্ষা ও সংরক্ষণ করবেন।
ঈশ্বরের বাক্য চিরকাল বিদ্যমান থাকে; যেমনটি বহু পূর্বেই
রাজা দাউদ বলেছিলেনঃ “প্রভু, তোমার বাণী চিরস্থায়ী,
তা স্বর্গেই চিরপ্রতিষ্ঠিত” [সামসঙ্গীত ১১৯:৮৯] । প্রভু যীশু
নিজে বলেছেনঃ “আকাশ ও পৃথিবী লোপ পাবে, কিন্তু আমার কোন
বাণী লোপ পাবে না” [মথি ২৪:৩৫, মার্ক ১৩:৩১, লুক ২১:৩৩]।
ঈশ্বরের ঈশ্বরসত্তার প্রকৃতি
প্রভু যীশু খ্রীষ্ট স্বর্গে ফিরে যাওয়ার আগে, তিনি তাঁর প্রেরিত শিষ্যদের এই আদেশ দিয়ে গিয়েছিলেনঃ “সুতরাং তোমরা যাও, সকল জাতির মানুষকে আমার শিষ্য কর; পিতা ও পুত্র ও পবিত্র আত্মার নামে তাদের বাপ্তিস্ম দাও” [মথি ২৮:১৯] । আপনি যদি একটু ভাল করে লক্ষ্য করেন তবে দেখতে পাবেন, প্রভু যীশু এই কথা বলেননি যে, “পিতা ও পুত্র ও পবিত্র আত্মার নামগুলিতে (বহুবচনে) বাপ্তিস্ম দাও!”; কিন্তু বলেছেন, “নামে” (একবচনে) বাপ্তিস্ম দাও। কারণ এটি একটাই নাম, এই নামের মাধ্যমেই ঈশ্বর তাঁর অনন্ত সত্তাকে মানুষের কাছে প্রকাশ করেছেন। এটি রহস্যময় এক নাম। যা সাধারণ মানুষের বোধগম্যতার বাইরে।
ঠিক এ কারণেই অনেকে আপত্তি তুলে বলেন, “এটা কীভাবে সম্ভব? তিনজন মিলে একজন কীভাবে হয়?”। তাদের এই আপত্তির মূল কারণ হল এক গুরুতর ভ্রান্তি। আসলে অনেকেই কি করেন যে, তারা ঈশ্বরের সত্তার উপর পদার্থ বিজ্ঞান ও গণিতের যোগ বিয়োগের নিয়ম প্রয়োগ করে বসেন। ঈশ্বরের সত্তাকে বোঝবার জন্য তারা মানুষের তৈরি হিসেবের মাপকাঠি ও মানদণ্ড ব্যাবহার করেন। যা একেবারেই উচিত নয়। ঈশ্বর কোনও জাগতিক বস্তু নন! তিনি অনন্ত এক সত্তা। তিনি পরমাত্মা। তিনি সমস্ত হিসেব, যুক্তি, গণনা ও বিশ্লেষণের ঊর্ধে। মহান ঈশ্বর, যিনি এই মহাবিশ্বকে সৃষ্টি করেছেন, এবং সৃষ্টি করেছেন প্রকৃতি, এর সকল জাগতিক ও গাণিতিক নিয়মাবলী। তিনি নিজে কিন্তু সেই নিয়মাবলীর অধীনে নন। যদি তিনি জাগতিক ও গাণিতিক নিয়মাবলীর অধীনে থাকেন, তাহলে তিনি ঈশ্বরই নন! তাই ঈশ্বর সৃষ্ট এই জগতের নিয়মাবলী ও হিসেব নিকেশ আমরা আধ্যাত্মিক বিষয়ের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারিনা।
পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মাঃ এক ঈশ্বর
পবিত্র বাইবেল আমাদের শিক্ষা দেয়, ঈশ্বর কেবল একজনই! এখন আমরা দেখবো যে, বাইবেলের কয়েকটি স্থানে “পিতা, পুত্র এবং পবিত্র আত্মার” উল্লেখ করার সাথে এই শিক্ষার সামঞ্জস্য কীভাবে প্রমাণিত হয়।
১. “সুতরাং তোমরা যাও, সকল জাতির
মানুষকে আমার শিষ্য কর; পিতা ও পুত্র ও পবিত্র আত্মার
নামে তাদের বাপ্তিস্ম দাও। আমি তোমাদের যা যা আজ্ঞা করেছি, সেই সমস্ত তাদের পালন করতে শেখাও। আর দেখ, আমি
প্রতিদিন তোমাদের সঙ্গে সঙ্গে আছি—যুগান্ত পর্যন্ত!” [মথি ২৮:১৯-২০]
২. আমি এবং পিতা, আমরা এক! [যোহন
১০:৩০]
৩. “তোমরা আমাকে বিশ্বাস কর: আমি পিতাতে আছি আর পিতা
আমাতে আছেন,” [যোহন ১৪:১১]
৪. তোমরা কিন্তু মাংসের অধীনে নয়, আত্মার অধীনেই রয়েছ, যেহেতু ঈশ্বরের আত্মা
তোমাদের অন্তরে নিজের আবাস করেছেন। কিন্তু খ্রীষ্টের আত্মা যার নেই, সে খ্রীষ্টের নয়। [রোমীয় ৮:৯]
৫. আমাদের কাছে কিন্তু ঈশ্বর আত্মা দ্বারাই সেই সবকিছু
প্রকাশ করেছেন, কারণ আত্মা সবই তলিয়ে দেখেন, ঈশ্বরের গভীর সমস্ত বিষয়ও তলিয়ে দেখেন। বস্তুত, মানুষের অন্তরে যে মানবাত্মা বিদ্যমান, সেই
মানবাত্মা ছাড়া কেইবা মানুষের অন্তরের কথা জানে? তেমনি
ঈশ্বরের আত্মা ছাড়া কেউই ঈশ্বরের অন্তরের কথা জানে না। [১ করিন্থীয় ২:১০-১১]
৬. পিতর বললেন, ‘আনানিয়াস,
শয়তান কেমন করে তোমার হৃদয় এতই দখল করেছে যে, তুমি পবিত্র আত্মার কাছে মিথ্যা বলেছ ও জমির টাকার কিছুটা রেখেছ?
জমিটা বিক্রি করার আগে তা কি তোমারই ছিল না? বিক্রি করার পরেও সেই টাকার উপরে তোমার কি পুরো অধিকার ছিল না? তবে এমন কাজ করার ভাব তোমার হৃদয়ে স্থান পেল কেন? তুমি তো মানুষের কাছে নয়, ঈশ্বরেরই কাছে
মিথ্যা বলেছ। [শিষ্যচরিত ৫:৩-৪]
৭. কিন্তু আমি যদি ঈশ্বরের আত্মার প্রভাবে অপদূত তাড়াই, তবে নিশ্চয়ই ঈশ্বরের রাজ্য আপনাদের মাঝে এসেই পড়েছে। [মথি ১২:২৮]
উল্লিখিত বাইবেলের উদ্ধৃতিগুলি একটু মনোযোগ দিয়ে পড়লেই বোঝা যায় যে, পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা—এঁরাই হলেন সেই একমাত্র সত্য ও জীবনময় ঈশ্বর। এঁরা তিনজন নন, বরং এঁরা তিনে মিলে এক! এটি একটি ঐশ রহস্য। এ বুঝতে মানুষের সমস্যা হয়। প্রকৃত সমস্যাটি লুকিয়ে রয়েছে মানবমনের সীমাবদ্ধতার মধ্যে, এবং ঈশ্বরের সত্তাকে ঠিক সেইভাবেই বিশ্লেষণ করার ভ্রান্ত প্রচেষ্টার কারণে, ঠিক যেভাবে আমরা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের বস্তুগুলিকে বিশ্লেষণ করে থাকি। যেমন, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন এবং অন্যান্য বৈজ্ঞানিক সূত্রের আলোয়। ঐ সূত্রগুলি কেবল পদার্থের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ও প্রাসঙ্গিক; ঈশ্বরের ক্ষেত্রে সে সব প্রয়োগ করা উচিত নয়, এবং তা সম্ভবও নয়।
এক ঈশ্বরে “পিতা ও পুত্র”- এর অর্থ কী?
সুস্থ স্বাভাবিক বুদ্ধিসম্পন্ন কোন ব্যক্তির পক্ষে কখনো এমনটা ভাবা সম্ভব নয় যে, ঈশ্বর কোনো স্ত্রী গ্রহণ করেছেন বা নারীর সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে একটি পুত্রের জন্ম দিয়েছিলেন। এমন বিকৃত চিন্তা ঈশ্বরের প্রতি এক জঘন্য ধর্মদ্রোহিতা বলে গণ্য হয়। প্রতিটি খ্রীষ্টানই এমন চিন্তাকে ঘৃণা করে এবং তা তিরস্কার করে। ঈশ্বর আমাদের মতো রক্ত-মাংসের মানুষ নন। মানুষ শারীরিক বাসনা কিংবা বংশ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যেই অধিকাংশ সময়ে শারীরিক সম্পর্ক বা যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে। কিন্তু ঈশ্বরের এ সবের কোনও কিছুরই প্রয়োজন নেই। কারণ ঈশ্বর নিজের অস্তিত্বের জন্য কারও বা কোনও কিছুরই ওপরে নির্ভরশীল নন। পবিত্র বাইবেল আমাদের জানায়ঃ “ঈশ্বর হলেন আত্মা, এবং যারা তাঁর উপাসনা করে, তাদের আত্মায় ও সত্যে উপাসনা করতে হবে” [যোহন ৪:২৪]। সহজ কথায়, ঈশ্বরের উপাসনা শুধুমাত্র দৈহিক বিষয়াবলি কিংবা বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান ও বিধিনিষেধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যোহন ৪:১৯-২৬ পদের প্রেক্ষাপট থেকে আমরা সে কথার স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি।
সুতরাং, যখন যীশুকে “ঈশ্বরের পুত্র” বলে অভিহিত করা হয়, তা প্রকৃতপক্ষে খ্রীষ্টের আত্মিক পরিচয় প্রকাশ করে। খ্রীষ্টের পুত্রত্ব (Sonship) হলো একটি আত্মিক সম্পর্ক, এটি কোনো শারীরিক কিংবা প্রজননগত সম্পর্কের পরিচয় নয়। এটি খ্রীষ্টের প্রকৃতি ও সত্তার একাত্মতাকে (Oneness) প্রকাশ করে। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, খ্রীষ্টকে প্রথম ‘ঈশ্বরের পুত্র’ বলে ডেকেছিলেন খ্রীষ্টানরা নয়, কিন্তু স্বয়ং পিতা ঈশ্বরই যীশুকে ‘তাঁর পুত্র’ বলে ডেকেছিলেন।
১. যখন ঈশ্বর স্বর্গদূত গ্যাব্রিয়েলকে কুমারী মারীয়ার
কাছে প্রেরণ করেছিলেন, তখন স্বর্গদূত তাঁকে বললেন: “ভয়
পেয়ো না, মারীয়া, কারণ তুমি
ঈশ্বরের অনুগ্রহ লাভ করেছ। আর দেখো, তুমি গর্ভবতী হবে এবং
এক পুত্র সন্তান প্রসব করবে, আর তুমি তাঁর নাম রাখবে
যীশু। তিনি মহান হবেন এবং তাঁকে ‘সর্বোচ্চ ঈশ্বরের পুত্র’ বলে ডাকা হবে।” এবং
স্বর্গদূত তাঁকে আরও বললেন: “পবিত্র আত্মা তোমার ওপর নেমে আসবেন এবং সর্বোচ্চ
ঈশ্বরের শক্তি তোমাকে আবৃত করে রাখবে; সেই কারণে, যে পবিত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করবেন, তাঁকে
‘ঈশ্বরের পুত্র’ বলা হবে” (লুক ১:২৮-৩৫)।
২. যখন দীক্ষাগুরু সাধু যোহনের হাতে যীশু খ্রীষ্ট
দিক্ষস্নাত হলেন, তখন স্বর্গ উন্মুক্ত হলো এবং
স্বর্গ থেকে এক কণ্ঠস্বর ভেসে এল— “তুমিই আমার প্রিয় পুত্র; তোমাতেই আমি সুপ্রসন্ন” (লুক ৩:২২; মার্ক ১:১১;
মথি ৩:১৭)।
৩. উল্লিখিত ঘটনা প্রসঙ্গে দীক্ষাগুরু সাধু যোহনের
বলেছিলেন,
“আমি দেখেছি এবং সাক্ষ্য দিয়েছি যে, ইনিই
ঈশ্বরের পুত্র” (যোহন ১:৩৪)।
৪. যীশু খ্রীষ্ট যখন তাঁর তিনজন প্রেরিত শিষ্যকে নিয়ে তাবোর পাহাড়ে গেলেন, তখন সেখানে দুজন নবী (Prophet), “মোশি ও এলিয়” — তাঁদের সামনে আবির্ভূত হলেন: “তিনি তখনও কথা বলছিলেন, আর দেখ, এক উজ্জ্বল মেঘ তাঁদের ঢেকে ফেললো; আর হঠাৎ সেই মেঘ থেকে এক কণ্ঠস্বর ভেসে এল, যা বলল, ‘ইনিই আমার প্রিয় পুত্র, যাঁর প্রতি আমি অত্যন্ত প্রীত। তোমরা তাঁর কথা শোনো!’ আর শিষ্যরা যখন তা শুনলেন, তখন তাঁরা উপুড় হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন এবং অত্যন্ত ভীত হয়ে পড়লেন। কিন্তু যীশু এগিয়ে এসে তাঁদের স্পর্শ করে বললেন, ‘ওঠো, ভয় পেয়ো না’” (মথি ১৭:১-৮; মার্ক ৯:৭; লুক ৯:৩৫)।
যাইহোক, বাইবেলে এমন অনেক পদ রয়েছে যা আমাদের জানায় যে, যীশু খ্রীষ্ট হলেন ঈশ্বরের পুত্র। এ এমন এক পুত্রত্ব যা এক ঐশ্বরিক সম্পর্কের আত্মিক পরিচয়ের ইঙ্গিত দেয়, যা স্বাভাবিক ভাবেই মানুষের বোধগম্যতার ঊর্ধ্বে। এই কারণেই পবিত্র বাইবেল বলে, “আমাদের স্বীকার করতে হয় যে, ধর্মভক্তির রহস্য সত্যিই মহান: তিনি মাংসে হলেন আবির্ভূত, আত্মায় ধর্মময় বলে হলেন প্রতিপন্ন, স্বর্গদূতদের দ্বারা হলেন দৃষ্ট, বিজাতীয়দের মধ্যে হলেন ঘোষিত, জগতে বিশ্বাস দ্বারা হলেন গৃহীত, সগৌরবে হলেন ঊর্ধ্বে উপনীত” (১ তীমথি ৩:১৬)। এভাবেই আমরা দেখতে পাই যে, পিতা হলেন ঈশ্বর, পুত্র হলেন ঈশ্বর এবং পবিত্র আত্মা হলেন ঈশ্বর। পিতা, পুত্র এবং পবিত্র আত্মা, যাদের কখনও কখনও ‘ত্রিত্ব ঈশ্বর’ (Triune God) হিসেবেও অভিহিত করা হয়। তাঁরা সকলেই এক ঈশ্বর – One God। এ এক ঐশ্বরিক সত্য ও রহস্য; আর যে মানুষ তা অস্বীকার করে, তিনি ঈশ্বরকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করেন। অন্যদিকে, যে মানুষ এ রহস্যে বিশ্বাস করেন, তিনি এর মধ্যেই এক অনন্ত আনন্দ ও আশীর্বাদ খুঁজে পাবেন।
ত্রিত্ব ঈশ্বর ও মানুষের পরিত্রাণের ইতিকথা
এটা পরিষ্কার যে, একজন আত্মসচেতন মানুষের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো তার সকল পাপের ক্ষমা লাভ করা, যাতে সে স্বর্গে প্রবেশ করতে পারে এবং তার আত্মা যে নরকে নিক্ষিপ্ত না হয়। পবিত্র বাইবেলে ঈশ্বর নিজের সম্পর্কে বলেছেন যে, তিনি হলেন “এক ন্যায়পরায়ণ ঈশ্বর ও ত্রাণকর্তা” (ইসাইয়া ৪৫:২১)। কিন্তু প্রশ্ন হল, ঈশ্বর কীভাবে ন্যায়পরায়ণ হতে পারেন এবং একই সাথে এমন একজন ত্রাণকর্তা হতে পারেন যিনি মানুষকে তার পাপ ও সেই পাপের শাস্তি থেকে উদ্ধার করতে পারেন? অন্য কথায়, তিনি কীভাবে একই সময়ে পূর্ণরূপে বিচারক এবং পূর্ণরূপে করুণাময় হতে পারেন? ব্যাপারটা কী স্ববিরোধী নয়?
এখানে মানুষের যুক্তি অসহায়। মানুষের কাছে এর কোনো উত্তর নেই। ঈশ্বর কী সত্যি আমাকে ক্ষমা করবেন? তিনি যে দয়ালু ও করুণাময় তা কী এরই মাধ্যমে প্রমাণ করবেন? নাকি তিনি আমাকে পাপের শাস্তি দেবেন এবং তিনি যে ন্যায়পরায়ণ বিচারক তা প্রমাণ করবেন আর দয়াহীন হয়ে থাকবেন? এই উভয়সংকটের কোনো সমাধান খুঁজে পাওয়া মানুষ ও স্বর্গদূত, উভয়ের পক্ষেই অসম্ভব। কিন্তু আনন্দের বিষয় ঈশ্বরের কাছে এর উত্তর আছে। আর তাঁর সেই উত্তরের মাঝেই আমরা প্রত্যক্ষ করি তাঁর অসীম প্রজ্ঞা ও পরাক্রম। আমরা সেখানে দেখতে পাই তাঁর প্রেম ও পূর্ণ করুণা, একই সময়ে ঠিক তেমনই দেখতে পাই তাঁর নিখুঁত ন্যায়পরায়ণতা ও পবিত্রতাকে।
উক্ত প্রশ্নের যত মানবীয় সমাধান আর উত্তর রয়েছে, তার সবই প্রায় ত্রুটিপূর্ণ এবং তা মানুষের আত্মাকে অনিবার্য ধ্বংসের দিকেই নিয়ে যায়; কারণ ঈশ্বরের দৃষ্টিতে পাপ অত্যন্ত গুরুতর এক বিষয়। ঈশ্বর পাপকে লঘু চোখে দেখেন না। পাপ হলো ঈশ্বরের প্রতি এক অবমাননা, কেননা এটি তাঁর অবাধ্যতারই নামান্তর। ঈশ্বর পাপকে ঘৃণা করেন। ধরুন আপনি কোনো সাধারণ মানুষকে অপমান করলেন, সে ক্ষেত্রে হয়তো আপনি হয়তো অল্প শাস্তি পেলেন। কিন্তু যদি ধরুন আপনি কোনো দেশের রাজা কিংবা রাষ্ট্রপতিকে অপমান করলেন, তবে আপনার শাস্তি হবে অনেক বেশি কঠোর। এবার ভেবে দেখুন, আপনি যদি চিন্তায়, কথায় আর কর্ম দ্বারা, যেভাবেই হোক না কেন, ঈশ্বরের অবাধ্য হয়েছেন, তবে তার পরিণাম কতই না ভয়াবহ হবে! কিছু মানুষের এমন ধারণা আছে যে, ঈশ্বর এক দাঁড়িপাল্লার একদিকে মানুষের সকল সৎকর্ম এবং অপর দিকে তার সকল কুকর্মগুলো রেখে ওজন করবেন, যাতে দেখা যায় কোনটি অধিক ভারী। প্রথমত, এই ধারণাটি ভুল; কারণ সৎকর্ম করা মানুষেরই অবশ্যকর্তব্য! সৎকর্ম করে মানুষ ঈশ্বরের প্রতি কোনো অনুগ্রহ দেখাছে না। আমরা এ কথা জানি যে মানুষের প্রণীত আইন ও ঈশ্বরের পবিত্র বিধান, উভয়ের কোনোটিতেই সৎকর্ম দ্বারা কৃত অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত বা মোচন করা যায় না। যদি এক ব্যাক্তি কোনও এক মানুষকে হত্যা করে এবং পরে তাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হলে, সে বিচারককে বলে, “আমি সৎকর্ম করে আমি আমার অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করবো!”; আপনার কী মনে হয় বিচারক তাকে ছেড়ে দেবেন? দ্বিতীয়ত, যদি এমন ধারণা সত্যও হয়, তবে আমাদের অবশ্যই জানতে হবে যে, ঈশ্বরের দৃষ্টিতে পাপের প্রকৃত ওজনের পরিমাপ কতটা। আমাদের জানা প্রয়োজন হতো যে, একটি মিথ্যা কথার ওজন কত, প্রতিটি মন্দ চিন্তার ওজন কত, অহংকারের ওজন কত; এবং সবশেষে, আমাদের অগণিত পাপরাশির সম্মিলিত ওজন ঠিক কতখানি। তাই যদি কোনো ব্যক্তি তার সকল পাপের ক্ষমা পাওয়ার উদ্দেশ্যে কিংবা তার অগণিত পাপরাশির সম্মিলিত ওজনকে ছাপিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে শুধুমাত্র নিজের সৎকর্মেরই ওপর ভরসা রাখে, তবে শেষমেশ সে এই সত্য জানতে পারবে যে, সে তার আত্মাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলেছে। তাহলে এই সমস্যার প্রকৃত সমাধান কী? এবং কীভাবে বা ঈশ্বর একইসাথে ‘এক ন্যায়পরায়ণ ঈশ্বর’ এবং ‘এক ত্রাণকর্তা’ হতে পারেন? এর উত্তর দেওয়া হয়েছে খ্রীষ্টের দেহধারণ বা অবতারত্বের মাধ্যমে।
খ্রীষ্টের অবতারণা – The
Incarnation of Christ
আমরা এ পর্যন্ত দেখলাম, পবিত্র বাইবেল সাক্ষ্য দেয় যে যীশু খ্রীষ্ট হলেন ঈশ্বরের পুত্র; এবং আমরা এ ব্যাখ্যাও করেছি যে, তাঁর এই পুত্রত্ব কোনো দৈহিক পুত্রত্ব বা কোনো প্রজনন প্রক্রিয়ারও ফল নয়, কারণ ঈশ্বর হলেন আত্মা। এটি এমন এক আত্মিক ও ঐশ্বরিক সম্পর্ক, যা কিনা মানুষের বোধগম্যতার বাইরেই রয়েছে। তবে আমাদের এ কথাও মনে রাখতে হবে, খ্রীষ্ট নিজে ঈশ্বর হয়েও একজন পূর্ণাঙ্গরূপে মানুষ হয়েছিলেন এবং তিনি নিজের সম্পর্কে বলেছিলেন: “মানবপুত্র সেবা পেতে আসেননি, বরং সেবা করতে এবং অনেকের মুক্তির মূল্যস্বরূপ নিজের প্রাণ বিসর্জন দিতে এসেছেন” (মথি ২০:২৮)। তাঁর এই কথা স্পষ্টই প্রকাশ করে যে, খ্রীষ্ট কেবলমাত্র শিক্ষা দিতে ও অলৌকিক কাজ করতে আসেননি, যদিও তিনি নিঃসন্দেহে উভয়ই করেছিলেন। খ্রীষ্ট মূলত আমাদের জন্য মৃত্যুবরণ করে আমাদের নরক যন্ত্রণার হাত থেকে উদ্ধার করতেই এসেছিলেন। তবে খ্রীষ্টের পক্ষে মানুষের জন্য তখনই প্রাণ বিসর্জন দেওয়া সম্ভব ছিল, যখন তিনি নিজে একজন মানুষ হয়েই জন্মাবেন। আর ঠিক এই উদ্দেশ্যেই খ্রীষ্টের অবতার গ্রহণ বা মানবদেহ ধারণের একান্ত প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল।
মূলত দুটি কারণ রয়েছে, যা থেকে জানা যায় যে, অন্য কারও পক্ষেই মানুষের আত্মাকে পরিত্রান করা সম্ভব নয়। প্রথমত, যিনি মানবাত্মার পরিত্রাতা হবেন, তাঁকে এমন একজন হতে হবে যিনি কখনও পাপ করেননি এবং যাঁর মধ্যে কোনো পাপ নেই। নচেৎ, তাঁকে তখন নিজের পাপের শাস্তিই বহন করতে হবে। একমাত্র যীশু খ্রীষ্টই এমন একজন, যিনি কখনও পাপ করেননি এবং যাঁর মধ্যে কোনো পাপ নেই। ঈশ্বরের দ্বারা প্রেরিত সকল প্রকৃত নবীগণ ধর্মীয় শিক্ষা ও ভবিষ্যদ্বাণীর ক্ষেত্রে নিজেরা সবই মেনে ছিলেন বটে, কিন্তু তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের ক্ষেত্রে তাঁরা কেউই এমন ছিলেন না, যাদের দোষত্রুটি দেখা দেয়নি। অর্থাৎ, তাঁরা সকলেই পাপ করেছিলেন। রাজা দাউদ বলেছেনঃ “আমি আমার অধর্ম স্বীকার করি, এবং আমার পাপ সর্বদা আমার চোখের সামনে থাকে। একমাত্র তোমারই বিরুদ্ধে আমি পাপ করেছি, এবং তোমার দৃষ্টিতে এই মন্দ কাজ করেছি” (সামসঙ্গীত ৫১:৩-৪)। কিন্তু যীশু খ্রীষ্টের বিষয়ে পবিত্র বাইবেল বলে যে, তিনি “পবিত্র, নির্দোষ, নিষ্কলঙ্ক, পাপীদের থেকে পৃথক এবং স্বর্গের চেয়েও ঊর্ধ্বে স্থান লাভ করেছেন” (হিব্রু ৭:২৬)। বাইবেল আরও বলে যে, তিনি “কোনো পাপ করেননি, এবং তাঁর মুখে কোনো ছলনা পাওয়া যায়নি” (১ পিতর ২:২২)। এরপর আরও বলা হয়েছে যে, তিনি “যিনি পাপ জানেননি” (২ করিন্থীয় ৫:২১), এবং “আমাদের পাপ হরণ করার জন্যই তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন; আর তাঁর মধ্যে কোনো পাপ নেই” (১ যোহন ৩:৫)। তাই তিনিই একমাত্র ত্রাণকর্তা; আর অন্য সকলেরই পক্ষে পরিত্রাণ পাওয়ার প্রয়োজন আছে।
দ্বিতীয়ত, যীশু খ্রীষ্ট কোনো নবী বা প্রেরিত বা রক্তমাংসের সাধারণ মানুষ নন। তিনি হলেন “মানব দেহে প্রকাশিত স্বয়ং ঈশ্বর!”—একই সাথে ঈশ্বর ও মানুষ। তিনি একই সাথে একই সময়ে ঈশ্বরের পুত্র এবং মানুষের পুত্র। মানুষের মৃত্যুর যে অর্থ হয় ও যেমন পরিণাম হয়, তা খ্রীষ্টের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কারণ তাঁর মৃত্যুর মূল্য অসীম। নিজের যন্ত্রণাময় ক্রুশ মৃত্যুর মাধ্যমে যীশু এমন প্রত্যেক ব্যক্তির আত্মাকে পরিত্রাণ করতে পারেন, যে তাঁর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেঃ “তিনিই আমাদের পাপের প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ; কেবল আমাদের পাপের নয়, বরং সমগ্র জগতের পাপেরও” (১ যোহন ২:২)। কিন্তু খ্রীষ্ট একই সাথে ঈশ্বর ও মানুষ। আর তাই, ঈশ্বরের মৃত্যু হতে পারে না। ক্রুশের ওপরে যিনি মৃত্যুবরণ করেছেন, তিনি হলেন খ্রীষ্টের সেই পূর্ণাঙ্গ মানবসত্তা। যিনি সর্ববিষয়ে ঈশ্বরকে সন্তুষ্ট করেছিলেন, ঈশ্বরের বিধানের সকল দাবী পূরণ করেছিলেন এবং যিনি বলেছিলেন যে, তিনি এসেছেন “অনেকের মুক্তির মূল্যস্বরূপ নিজের প্রাণ উৎসর্গ করতে” (মথি ২০:২৮)।
মানুষের পরিত্রাণের জন্যে যীশু খ্রীষ্টের মৃত্যু
একটি সুনিশ্চিত সত্য, যার সপক্ষে অন্তত চারটি
অভ্রান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়ঃ
১. যীশু খ্রীষ্টের আগমনের শত শত বছর আগেই নবীরা এ
বিষয়ে অনেক ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন । সেই ভবিষ্যদ্বাণীগুলো বাইবেলের ‘পুরাতন
নিয়ম’-এ সংরক্ষিত আছে, যা ইহুদিদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ।
বাইবেল পণ্ডিতদের গণনা অনুযায়ী, পুরাতন নিয়মে খ্রীষ্টের
আগমন ও তাঁর কাজকর্মের বিষয়ে ৩০০-টিরও অধিক ভবিষ্যতবাণী লিপিবদ্ধ করা আছে।
২. নিজের মৃত্যুর পূর্বে খ্রীষ্ট তাঁর প্রেরিত
শিষ্যদের বহুবার বলেছিলেন যে, ইহুদিরা তাঁকে হত্যা করবে এবং
তৃতীয় দিনে তিনি পুনরুত্থিত হবেন এবং সেই সঙ্গে তিনি পুরাতন নিয়ম থেকে শাস্ত্রের
সেই অংশগুলি উল্লেখ করেছিলেন, যেখানে আগে থেকেই লেখা ছিল
যে তেমন সব ঘটবে।
৩. প্রত্যক্ষদর্শীরা আমাদের জন্য সেই ঘটনা লিপিবদ্ধ
করে গেছেন। সেই সব ঘটনার বিবরণ আমারা মূলত বাইবেলের নতুন নিয়মে এবং মণ্ডলীর
প্রাচীন নথিগুলিতে দেখতে পাই।
৪. পবিত্র বাইবেল, তার পুরাতন নিয়ম ও নুতন নিয়ম উভয় অংশেই, স্পষ্টভাবেই উল্লেখ করে যে, মানুষের পরিত্রাণের একমাত্র পথ হলো যীশু খ্রীষ্টের মৃত্যু।
শেষের কথা
সবশেষে আমরা মানুষের আত্মার পরিত্রাণের ক্ষেত্রে পিতা, পুত্র এবং পবিত্র আত্মার ভূমিকার প্রসঙ্গে আসি। পবিত্র বাইবেল বলেঃ “ঈশ্বর জগতকে এমন ভালোবেসেছেন যে, তিনি তাঁর একমাত্র পুত্রকে (যীশু খ্রীষ্টকে যেন আমাদের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেন) দান করলেন, যেন যে কেউ তাঁকে বিশ্বাস করে, সে বিনষ্ট না হয় বরং অনন্ত জীবন লাভ করে” (যোহন ৩:১৬)। এখানে আমরা দেখতে পাই যে, পিতা মানুষকে ভালোবাসেন এবং তাদের আত্মার পরিত্রাণ কামনা করেন; আর পুত্র সেই পরিত্রাণ লাভের মূল্য স্বেচ্ছায় পরিশোধ করেছেন। অন্যদিকে পবিত্র আত্মা মানুষের বিবেককে জাগ্রত করে তোলেন এবং তাকে তার পাপ সম্পর্কে সচেতন করে তোলেন (যোহন ১৬:৭-৮), যাতে সে যীশু খ্রীষ্টকে নিজের ত্রাণকর্তা হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। সুতরাং, ঈশ্বর তাঁর প্রেমের মাধ্যমেই মানুষকে পরিত্রাণ দান করেন, তবে তা কখনোই তাঁর পবিত্রতা ও ন্যায়বিচারের বিনিময়ে নয়। ঈশ্বর, ‘পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা’, একমাত্র সত্য ও জীবনময় ঈশ্বর। তাঁকে ছাড়া আর অন্য কারও হাতেই পরিত্রাণ নেই।
