কেন আমি হিন্দুধর্ম ত্যাগ করেছি?
ভূমিকা
২০১১ সালে আমি যখন
স্বেচ্ছায় ও আইনত ভাবে খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করেছিলাম, সেদিন থেকে নিয়ে আজও অবধি আমার চেনা পরিচিত পরিধির মানুষজন থেকে শুরু
করে নানা অচেনা মানুষ প্রায়ই আমাকে এই প্রশ্ন করেছেনঃ “কেন তুমি হিন্দু থেকে খ্রীষ্টান হলে?” বা “খ্রীষ্টধর্মে তুমি এমন কী খুঁজে পেলে যা হিন্দুধর্মে পাওনি?”। অবশ্যই, যারা এই ধরণের প্রশ্ন করেছেন তাদের অধিকাংশই হিন্দুধর্মাবলম্বী। তবে
আমি একটা বিষয় লক্ষ্য করেছি, যারা আমাকে এই ধরণের প্রশ্ন
করেছেন, তারা আমার প্রতি একপ্রকার রাগ বা অসন্তোষের
কারণেই ওই ধরণের প্রশ্ন করেছেন। তারা আসলে সত্যিটা জানবার জন্য প্রশ্ন করেননি,
তারা প্রশ্ন করেছেন আমাকে বেকায়দায় ফেলার জন্য বা পুরো বিষয়টিকে
তর্কে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে।
সত্যি কথা বলতে, এই ধরণের প্রশ্নে আমি একটুও অস্বস্তি বোধ করি
না। কারণ আমি হিন্দু সমাজের লোকজন ও তাদের মন মানসিকতা কেমন সে ব্যাপারে আমি
ভালমতোই অবগত। কী ভাবে একজন মানুষ জগতশ্রেষ্ঠ মহান হিন্দুধর্ম ত্যাগ করতে পারে,
এ ব্যাপারটাই অনেক হিন্দুধর্মাবলম্বীরা হজম করতে পারেন না। এই
একই মানসিকতা মুসলিমদের মধ্যেও দেখা যায়। এখন প্রশ্ন হল, একজন
মানুষ জন্মসূত্রে পাওয়া তার ধর্ম কী ত্যাগ করতে পারে? এর
উত্তর হল, হ্যাঁ! পারে বৈকি!। আমাদের সমাজে প্রায় বহু কাল
ধরেই এমনটা হয়ে আসছে। তবে বর্তমান সময়ে ধর্ম পরিবর্তন বা ধর্ম ত্যাগ করবার ঘটনা
ব্যাপক হারে ঘটতে দেখা যাচ্ছে। এর পিছনে যথেষ্ট কারণও আছে।
আমি কেন “হিন্দুধর্ম
ত্যাগ করে খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করলাম”, আমার পক্ষে এই প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দেওয়া সম্ভব নয়। দেওয়া যায়না।
হটাৎ কোনও এক সকালে ঘুম থেকে উঠেই, মনের খেয়াল বশে “আমি
খ্রীষ্টান হবো” বলে সিধান্ত নিইনি। আমার হিন্দু থেকে
খ্রীষ্টান হয়ে ওঠার পিছনে রয়েছে আমার ব্যাক্তিগত জীবনের অনেক অভিজ্ঞতা, পারিপার্শ্বিক মানুষজনের জীবনের দৃষ্টান্ত, ভারতীয়
সমাজের বাস্তব চিত্র, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব নিয়ে পড়াশুনা,
দর্শন শাস্ত্রের পড়াশুনা, খ্রীষ্টধর্ম
নিয়ে পড়াশুনা। এছারাও আরও অন্যান্য নানাবিধ কারণ আছে যা ধাপে ধাপে বলা প্রয়োজন।
তখনই মাত্র “কেন তুমি হিন্দু থেকে খ্রীষ্টান হলে?” বা “খ্রীষ্টধর্মে তুমি এমন কী খুঁজে
পেলে যা হিন্দুধর্মে পাওনি?”, এই ধরণের প্রশ্নের
যথাযোগ্য উত্তর দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠবে। নয়তো, সম্পূর্ণ
ব্যাখ্যার অভাবে মানুষের কাছে আমার খ্রীষ্টান হয়ে ওঠার কারণটা অপ্রাসঙ্গিক বা ভুল
সিধান্ত বলে মনে হতে পারে। তবে আমি খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করেছি বলে লোকজন কে কী মনে
করলো বা কে কী বললো, তা নিয়ে আমি বিন্দুমাত্র যন্ত্রণাবোধ
করিনা।
তার আগে বলো, তুমি হিন্দু কেন?
আপনি যদি কোনো হিন্দুকে
এই প্রশ্ন করেন, “কেন সে হিন্দু?”;
সঙ্গে সঙ্গে সে উত্তর দেবেঃ “কারণ আমার মা-বাবা হিন্দু তাই
আমি হিন্দু বা আমি হিন্দু পরিবারে জন্ম নিয়েছি তাই আমি হিন্দু!” কিন্তু এই একই কথা তো অন্যান্য ধর্মের লোকেরাও বলতে পারে! তবে এ
ক্ষেত্রে “হিন্দু ধর্মই একমাত্র সত্য ধর্ম” এ কথা
কী ভাবে সত্য বলে প্রমাণ হচ্ছে? যে ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে
একটি শিশু পৃথিবীতে জন্মায়, সেটা তার ব্যাক্তিগত সিধান্ত
নয়। ঐ শিশু নিজের ইচ্ছায় ওই ধর্মকে নিজের ধর্ম বলে মেনে নেয়নি। যেহেতু সে ওই
পরিবারে জন্ম নিয়েছে, যেহেতু তার মা-বাবা ওই ধর্মেরই
মানুষ, তাই ওই শিশুও ওই ধর্মেরই একজন বলে গণ্য হচ্ছে। এখন
এই শিশু যদি বড় হয়ে নিজের জন্মসূত্রে পাওয়া ধর্ম ত্যাগ করে অন্য ধর্মে চলে যায়,
তাহলে সে কী ভাবে অপরাধী হয়ে গেল?
এবার ধরুন এক শিশু, যে এক নাস্তিক পরিবারে জন্ম নিয়েছে, যার মা-বাবা দুজনেই নাস্তিক, স্বাভাবিক ভাবেই
ঐ শিশুর কাছে ঈশ্বর বা ধর্ম জিনিসটাই অজানা অপ্রাসঙ্গিক এক বিষয়। এবার ধরুন,
এখন ঐ শিশু যখন বড় হয়ে ঈশ্বরের সন্ধান করতে শুরু করলো, ধর্ম আসলে কী তা নিয়ে পড়াশুনা করতে লাগলো, তারপর
একদিন সে নাস্তিক থেকে আস্তিক হয়ে গেল। নিজের অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী
কোনও একটা ধর্ম গ্রহণ করে নিল, এক্ষেত্রেও আপনি কী তাকে
অপরাধী বলেই গণ্য করবেন? কেন না এক্ষেত্রেও সে তো
জন্মসূত্রে পাওয়া “সেই বিশ্বাস” ধরে রাখেনি! সে
তার মা-বাবার মতো আর নাস্তিক হয়ে বাঁচতে চায়নি।
অনেক মানুষ এই সহজ
কথাটা বুঝতেই চায়না যে, মানুষের আপন ধর্ম বলে আদৌ কিছু হয়না, মানুষকে
ধর্ম গ্রহণ করতে হয়! প্রকৃতপক্ষে ধর্ম হল এক অভ্যন্তরীণ চেতনার বিষয়। চেতনা কখনই বাইরে থেকে
মানুষকে দেওয়া যায়না। চেতনা জন্মসূত্রে পাওয়া যায়না। চেতনা সম্পত্তি হিসেবে
মা-বাবার কাছ থেকেও পাওয়া যায়না। চেতনা এক প্রকার
জটিল বিষয়। এটা নিয়ে যদি আমাদের প্রাথমিক কিছু ধ্যানধারণা না থাকে, তাহলে মানুষ কেন ধর্ম পরিবর্তন করে, মানুষ কেন
ধর্ম ত্যাগ করে নাস্তিক হয়ে যায়, এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর
খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়।
চেতনা আসলে কী?
সাধারণ ও সহজ ভাষায়
বললে, চেতনা হলো “যুক্তির
এমন এক বিচার পদ্ধতি যার মাধ্যমে মানুষ কোনও একটি নির্দিষ্ট কাজ সম্পাদন করবার আগে,
অথবা যে কাজ সম্পাদন এখনও প্রক্রিয়াধীন, অথবা ইতিমধ্যেই যে কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে, তার
নৈতিক গুণমানকে স্বীকৃতি দেয়।”
এই সংজ্ঞাটি আরও
ভালোভাবে বুঝতে হলে, চেতনা
বলতে আসলে কী বোঝায় না, তা প্রথমেই উল্লেখ করা প্রয়োজন। চেতনা কোনও আবেগ বা অনুভূতি নয়, এমনকি “অন্ত্রের
অনুভূতি”ও নয়, যেমনটি
সমাজের অনেক বুদ্ধিজীবীরা প্রায়ই বলে থাকেন। বরং, চেতনা
হল মানুষের সুক্ষ বুদ্ধির একটি ক্রিয়া, যুক্তির এক
অসাধারণ বিচার। কিন্তু আমাদের এ কথা মনে করা উচিত নয় যে আবেগ বা অনুভূতিগুলি
গুরুত্বহীন বা নৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক, তবে এগুলিকে সরাসরি
চেতনার সাথে চিহ্নিত করা উচিত নয়। যদি মানুষের আবেগ ও অনুভূতি তার সৎ স্বভাব থেকে
উদ্ভূত হয়, তবে কোনও কাজ নৈতিকভাবে ভালো না মন্দ সে
সম্পর্কে সে যুক্তির বিচার করতে গিয়ে অনেক উপকার পেতে পারে।
অন্যদিকে মানুষের আবেগ
ও অনুভূতি যদি তার নেতিবাচক চরিত্র থেকেই উদ্ভূত হয়, সেক্ষেত্রে সে ভালো ও মন্দের যুক্তির বিচার করতে গিয়ে ভুল করে বসবে।
আমাদের এ কথা ভুলে গেলে চলবে না, মানুষের আবেগ ও অনুভূতি
তার চিন্তা, বিশ্লেষণ ও সিধান্তের উপর দারুণ ভাবে প্রভাব
ফেলতে সক্ষম। যেমন ধরুন, আদালতের একজন কঠোর বিচারপতি একজন
ব্যাক্তিকে ধর্ষণ করার অপরাধে ফাঁসির সাজা শোনালো। কিন্তু দেখা গেল তার নিজেরই
পুত্র একসময় কোনও এক মেয়েকে ধর্ষণ করলো, সেক্ষেত্রে তখন
ওই বিচারপতিই নিজের পুত্রকে আইনের হাত থেকে প্রাণে বাঁচাবার জন্য অন্য কোন উপায়
অবলম্বন করতে পারে। কেননা সে তার আপন সন্তান। অনেক সময় এমন পরিস্থিতিতে মানুষের
আবেগটাই বেশি কাজ করে, পক্ষপাতহীন নির্ভুল যুক্তি নয়।
আমি যে হিন্দুধর্ম
ত্যাগ করে খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করেছিলাম, আমার এই সিধান্তে, আবেগ বা অনুভূতি, এসবের কোনও কিছুই মূল ভূমিকা পালন করেনি। মানুষ যখন ধর্ম ত্যাগ করে,
কিংবা ধর্ম পরিবর্তন করে অন্য ধর্মে চলে যায়, তাকে সব দিক বিবেচনা করেই সেই সিধান্ত নিতে হয়। মানুষের মন ও তার
চেতনার উপরে কোনও বাহ্যিক ক্ষমতা খাটানো চলে না। অথচ হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মতে,
কেউ যদি হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে, তাহলে সে
একজন বিশ্বাসঘাতক, সে একজন ঘোরতর পাপী, এমনকি তাকে অনেক সময় দেশদ্রোহীর তকমাও দেওয়া হয়। ঠিক কী কী কারণে আমি
হিন্দুধর্ম ত্যাগ করেছি, তার খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ ব্যাখ্যা
পরপর সাজিয়ে গুছিয়ে এখানে লিখছিনা । তেমনটা করতে গেলে আমাকে একটা বই লিখতে হবে।
বরং আমি এখানে যা লিখছি, তা হল একটা সহজ সরল সারমর্ম। যা
পড়ে যে কোনও ব্যাক্তি পুরো বিষয়টিকে বাস্তবের প্রেক্ষাপটে যাচাই করতে পারবেন।
১. হিন্দু সমাজে হিন্দু
ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে একতা ও ভাতৃত্বের অভাব
একটা সভ্য ও শিক্ষিত
সমাজে মানুষে মানুষে একতা, পরস্পরের
প্রতি প্রেম এবং ভাতৃত্ব বোধ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু হিন্দু সমাজে এর বিপরীত
রুপ দেখতে পাওয়া যায়। হিন্দু সমাজে ভয়ঙ্কর রকমের জাতপাত ও ভেদাভেদ চোখে পড়ে।
হিন্দুধর্মাবলম্বী না হলেও, এ কথা ভারতের সকল মানুষই
জানে। হিন্দুধর্ম মানুষকে উঁচুজাত এবং নিচুজাত ভেদে বিভক্ত করে রেখেছে। হিন্দুধর্ম
অনুযায়ী ব্রাহ্মণরাই সমাজের উচ্চ শ্রেণির মানুষ, তাদের
অধীনে তাদের নির্দেশ মেনেই সকলকে ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসন মেনে চলতে হবে ।
হিন্দুধর্মের যাবতীয়
ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান ব্রাহ্মণদের দ্বারাই পরিচালিত ও অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। একজন
ব্রাহ্মণ কখনই শূদ্রের হাতে জল পান করবে না, তার সাথে এক জায়গায় খেতে বসবে না। অথচ ব্রাহ্মণ হোক কিংবা শূদ্র,
এরা দুজনেই হিন্দু। এরা দুজনেই নাকি একই ভগবানের উপাসক। ভারতে
প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত উচ্চবর্ণের হিন্দুদের হাতে নিম্ন
বর্ণের হিন্দুদের নির্যাতন, অত্যাচার ও অপমানের ঘটনা ঘটতে
দেখা যায়। এখানেই শেষ নয়, দলিত কিংবা আদিবাসী সম্প্রদায়ের
মেয়েদের সম্মান নষ্ট করা থেকে শুরু করে, তাদের ধর্ষণ করে
খুন করার মতো ঘটনাও প্রায় দিনই খবরের শিরোনামে উঠে আসে। অনুসন্ধানে ধরা পড়ে,
সেই ধর্ষক একজন উচ্চবর্ণের হিন্দু। তবে এই সমস্ত অপরাধীরা
রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আইনের হাত মচকিয়ে পালিয়ে যায়। আমি ছেলে বেলা থেকে আরও একটা
বিষয় লক্ষ্য করেছি, আমাদের দেশে বাঙালিদের প্রতি
অবাঙালিদের একটা বিদ্বেষ আছে। এর সঠিক কারণ আমার জানা নেই।
যেমন ধরুন, কোন বাঙালি যদি ভারতের অন্য কোন অবাঙালি
রাজ্যে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যায়, সেখানে গিয়ে তাকে
বিভিন্ন রকমের অন্যায় অত্যাচার সহ্য করতে। অথচ বহুকাল থেকেই পশ্চিমবাংলার বুকে বহু
অবাঙালি জাতির মানুষ এসে বাসা বেঁধেছে, বলতে গেলে একেবারে
জাঁকিয়ে বসেছে। সময়ের সাথে বুঝলাম, হিন্দু সম্প্রদায়
আসলেই জাতি ভেদে বিভক্ত। তারা নিজেদেরকে হিন্দু ধর্মের অনুসারী বললেও, প্রকৃতপক্ষে সকলেই স্বার্থপর ও স্বজাতি প্রিয় মানুষ। এমনকি ভাষা নিয়েও
হিন্দুসমাজে ভেদাভেদ ও অশান্তির শেষ নেই।
ভাবতে পারেন? যাদের স্বাধীনতার জন্য এই দেশের পূর্বপুরুষরা
নিজেদের জীবন বিসর্জন করেছিলেন, তাঁরা কখনও কি এ কথা
ভেবেছিলেন, এ দেশের মানুষ ধর্মীয়, সাম্প্রদায়িক বা জাতিগত পরিচয়ের কারণে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে যাবে?
ওই সমস্ত কারণে এই দেশের মানুষ একদিন খুনোখুনি করবে? আমার মনে হয়, তাঁরা যদি আজ বেঁচে থাকতেন এবং
নিজেদের চোখে ভারতের হিন্দু সমাজের বর্তমান রুপ দেখতে পেতেন, তাহলে তাঁরা বোধহয় নিজেরদের সমস্ত আত্মবলিদানের জন্য আফসোস করতেন।
তবে ভারতের একটা অদ্ভুত
বিষয় এই যে, এখানে ধর্ম নিয়েই
রাজনীতি করাটা সবচেয়ে বেশি লাভজনক। কারণ ভারতের নেতা-মন্ত্রীরা এ কথা ভাল ভাবেই
বোঝেন, হিন্দুদের মন্দির গড়ে দিলে তারা খুশি হয়ে যে
পরিমান ভোট দেবে, ততটা পরিমান ভোট কিন্তু স্কুল কলেজ বা
ভাল হাসপাতাল গড়ে দিলে দেবে না। বহিরাগত কোনও শক্তি নয়, হিন্দু
জাতির এই মানসিকতাই একদিন সম্পূর্ণ হিন্দু জাতিকে বিনাশ করে দেবে।
২. হিন্দু সমাজে হিন্দু
ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ভদ্রতা (Manners) এবং শিষ্টাচারের (Etiquette) অভাব
আমি অনেক বার যখন
হিন্দুদের সাথে আমার ধর্ম পরিবর্তনের কারণ উল্লেখ করে ধর্মতাত্ত্বিক (Theological) আলোচনা করতে চেয়েছি, তখনই তাদের কাছ থেকে আমি নানা রকমের কটূক্তি সহ বিভিন্ন অশ্লীল শব্দের
আঘাত পেয়েছি। ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক মাধ্যমে যখন আমি আমার ধর্ম
পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেছি, তখনই দেখেছি একদল হিন্দু
এসে কমেন্ট বক্সে নিজেদের মনের ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছে। “টাকার লোভে খ্রীষ্টান হয়েছি!”,
এমন সব কথা বলে আমাকে গালাগালি দিয়েছে। আমার কাছে এটা অবশ্য নতুন
কোন ব্যাপার না।
যে ধর্মের মানুষ এমন সব
দেবতা আর ভগবানের উপাসনা করে, যারা ব্যাভিচার, যৌন অনাচার ও ধর্ষণের মতো
জঘন্য অপরাধ করেছে, তাদের উপাসকদের কাছ থেকে ভাল কিছু কি
আশা করা যায়? কেউ হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে অন্য ধর্মে চলে
গেছে বলেই যে তার সঙ্গে খারাপ ও অভদ্র আচরণ করতে হবে, এটা
কোন প্রশংসা কুরাবার মতো কথা নয়। বরং এমন মানসিকতা রাখতে হবে, যাতে আমি জানতে পারি একজন মানুষ কেনইবা জন্মসুত্রে পাওয়া তার ধর্ম
ত্যাগ করেছে। এতে মানুষের মধ্যে জ্ঞানের বৃদ্ধি ঘটে। আমি ধর্মত্যাগী বলে কোন
হিন্দু আমাকে গালাগালি দিলে বা কটূক্তি করলে তাতে হিন্দু ধর্ম মহান বলে প্রতিপন্ন
হবে না, বা তা সত্য বলেও মান্যতা পাবে না।
আমার ব্যাক্তিগত
অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, খ্রীষ্টান
সম্প্রদায়ের মধ্যে আমি তেমনটা দেখিনি। খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে যে পরিমান
ভদ্রতা ও শিষ্টাচার দেখতে পাওয়া যায়, তার দশ শতাংশও
হিন্দুদের মধ্যে দেখা যায়না। সত্যি কথা বলতে, খ্রীষ্টধর্ম
গ্রহণ করবার পরেই আমার আচরণ ও চারিত্রিক বৈশিষ্টের উপর যে দারুন ইতিবাচক প্রভাব
ফেলেছে, তা দেখে আমার চেনা পরিচিত মানুষজন যথেষ্ট তাজ্জব
হয়েছিল। অথচ যে সনাতন ধর্মের শিক্ষাদীক্ষা নাকি এত মহান, সেই
ধর্মের অনুগামীদের এমন দুরবস্থা দেখলে অবাক হতে হয়।
৩. হিন্দুধর্মের মধ্যে
প্রচলিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের বৈধ উৎসের অভাব
হিন্দু ধর্মের সবচেয়ে
অবাক করা বিষয় হল, এই
ধর্মে অসংখ্য দেবদেবী, অবতার, প্রাকৃতিক
বস্তু ও প্রাণীর পূজা করা হয়। ফলে হিন্দু ধর্মে নানা রকমের ধর্মীয় ক্রিয়াকলাপ ও
আচার অনুষ্ঠানের শেষ নেই। হিন্দুধর্মাবলম্বীরা সারা বছর ধরেই কোনও না কোনও
দেবদেবীর পূজাই ব্যাস্ত থাকে। অবাক করা বিষয় এই যে, নব্বই
শতাংশ হিন্দুরাই জানেন না যে, তারা কেনই বা ওই সবকিছুর
পূজা করেন। তাদের পারিবারিক প্রথা কিংবা বংশ পরম্পরায় বহুকাল ধরেই ওইসব পূজা করা
হয়ে আসছে বলে, তারাও ওই একই ধারা মেনে এগোচ্ছে। আমি তাদের
মধ্যে একটা বিষয় লক্ষ্য করেছি যে, তারা ধর্মীয় বিষয় নিয়ে
প্রশ্ন করে না। জগতের সৃষ্টিকর্তা যেখানে একজনই আছেন, সেখানে
তাঁকে বাদ দিয়ে পশুপাখি, প্রাকৃতিক বস্তু কিংবা অলীক
দেবদেবীর উপাসনা কেন?
হিন্দুরা বলবেন, তারা এক ঈশ্বরের অস্তিত্বই স্বীকার করেন।
কিন্তু তাদের ধর্মীয় ক্রিয়াকলাপ ও বাস্তব জীবন অন্য কথা বলে। অধিকাংশ দেবদেবী
পুরাণ কথিত। এরা কাল্পনিক। এই সব দেবদেবীর পূজা করা শুরু হয় আনুমানিক ১৫০০-২০০০
বছর আগে। অর্থাৎ, বৈদিক যুগে ওই সব দেবদেবীর কোনও
অস্তিত্ব ছিল না। কিন্তু তা সত্ত্বেও, ভারতের হিন্দু
অধিবাসীরা তাদের জীবনে ওই সকল দেবদেবীর পূজা প্রচলন করেছিল। কিন্তু যদি প্রশ্ন করা
হয়, ওই অলীক দেবদেবী ও প্রাকৃতিক বস্তুর পূজা তারা কেন
করে? হিন্দু ধর্মের কোন শাস্ত্রে তার লিখিত নির্দেশনা
দেওয়া আছে? তারা কিন্তু কোনও উত্তর দিতে পারে না। অবশ্য,
অনেকেই নানা রকমের ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন ও আধ্যাত্মিক কারণ
দেখিয়ে থাকেন বটে, তবে সেগুলিকে তাদের ব্যাক্তিগত মতামত
বলেই গণ্য করা হয়। তারা বৈধ্য শাস্ত্র থেকে ওইসব ধর্মীয় ক্রিয়াকলাপের সপক্ষে
প্রমাণ পেশ করতে পারবেন না। তাই দেখা যায়, ধর্মীয় উপাসনা
ও পূজন ক্রিয়ার ব্যাপারে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের মধ্যে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। আবার,
বিভিন্ন সময়ে বিশেষ কোনও মানুষের ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণ পূজারীরা
পূজার নিয়ম কানুন পাল্টে ফেলে। কিন্তু শাস্ত্র অনুযায়ী কী তেমনটি করার নির্দেশ
দেওয়া আছে? এর সদুত্তর এনাদের কাছ থেকে পাওয়া যাবে না।
৪. হিন্দুধর্মের মধ্যে
মৌলিক এবং গঠনমূলক শিক্ষার অভাব
কোনো সম্প্রদায় বা
জাতির মানুষকে যদি একই মনোভাব ও বিশ্বাস নিয়ে চিরকাল এই সমাজে টিকে থাকতে হয়, তবে সেই জাতি বা সম্প্রদায়ের কাছে এমন এক
দর্শন অথবা ধর্মীয় বিশ্বাস থাকাটা একান্ত জরুরী যার ওপরে সকলেই নির্দ্বিধায় একমত
পোষণ করবে। তখনই সেই সম্প্রদায় বা জাতির মানুষের মধ্যে ঐক্য (Unity) থাকবে। তবেই সেই জাতির উন্নতি হবে। তবেই সেই জাতি পৃথিবীর উপর প্রভুত্ব
করবে। তবেই সেই জাতি শক্তিশালী হবে। না হলে, সেই জাতির
মধ্যে দেখা দেবে বিভেদ ও অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ। তাদের মধ্যে দেখা দেবে শাসন ক্ষমতা ও
সম্পদ নিয়ে ব্যাপক হারে দুর্নীতি। এই সকল কারণে সেই জাতি বিদেশী শক্তির কাছে
পরাভূত হবে। ঠিক তাই, ওই কারণেই ভারতের হিন্দুরা একসময়
বিদেশী জাতির কাছে পরাজিত হয়েছিল এবং তাদের দাসত্ব স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল।
যারা বলেন, ভারতীয় হিন্দুরা খুবই ভাল মনের, সহজ সরল স্বভাবের মানুষ ছিল বলেই বহিরাগত শক্তিরা তাদের উপর অত্যাচার
করেছিল এবং তাদের ধন-সম্পদ লুটপাট করেছিল, এ কথা একবারেই
অবাস্তব। কোনো জাতি ভেতর থেকে দুর্বল না হলে, বাইরের কোনও
শক্তিই তাকে পরাজিত করতে পারে না। মুঘল বা ইংরেজ জাতি ভারতীয়দের ভিতর সেই দুর্বলতা
দেখতে পেয়েছিল। কী সেই দুর্বলতা? ধর্মীয় জাতপাত! হিন্দু
ধর্মের মানুষ চারটি “বর্ণে” বিভক্ত। এদের মধ্যে ব্রাহ্মণরা হল উচ্চ বর্ণের হিন্দু।
এদের হাতেই ছিল হিন্দু সমাজের বিধিবিধান। এই ব্রাহ্মণরা নিম্ন বর্ণের হিন্দুদের
(শূদ্র) নানা ভাবে শোষণ ও অত্যাচার করতেন। তাদের ম্লেচ্ছ বলে সম্বোধন করা হত। ধর্মীয়
বিশ্বাসের দিক দিয়ে এই শূদ্ররা হিন্দু হলেও, মন্দিরে
প্রবেশ করে দেবদেবীর পূজা করা, কুয়ো থেকে জল তোলা,
বাজারে গিয়ে সবজি কিনে আনা, ছেলেমেয়েদের
পড়ালেখা শেখানোর ব্যাপারে তাদের উপর করা নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল। কথা অমান্য করলে
তাদের মারধর করা হত।
অন্যদিকে হিন্দু
ব্রাহ্মণরা সামাজিক সকল সুবিধা ভোগ করতেন। এবার ভেবে দেখুন, এমন অবস্থায় এই জাতির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি
কীরূপ হতে পারে! অত্যাচারিত ও নিপীড়িত জাতি কি এক সময় রুখে দাঁড়াবে না? তারা কি যুদ্ধ ঘোষণা করবে না? আর তাই হল।
বহিরাগত শক্তিগুলি যখন ভারতে এল, তাদের দলে যোগ দিল
অত্যাচারিত ও নিপীড়িত ওই সব নিম্ন শ্রেণীর হিন্দুরা। এরা পূর্বপুরুষদের থেকে পাওয়া
ধর্ম তো ত্যাগ করলই, এমন কী নিজেদের সম্পূর্ণ জাতিগত
পরিচয় পাল্টে ফেললো। একজন মানুষ কেনই বা এমন এক ধর্মের সঙ্গে যুক্ত থাকবে, যেখানে তাকে তার জাতিগত পরিচয়ের জন্য অসম্মানিত, নির্যাতিত ও সামাজিক অবহেলার শিকার হতে হয়? আজও
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ব্যাপক হারে জাতিগত বৈষম্য প্রচলিত আছে, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলঃ উত্তর প্রদেশ, মধ্য
প্রদেশ, রাজস্থান ও বিহার।
হিন্দু ধর্মে জাতিগত
বৈষম্যই একমাত্র ধর্মীয় সমস্যা নয়, এর আরও একটি বড় সমস্যা হল, একজন হিন্দু
ব্যাক্তির কাছে মৌলিক ভাবে নির্দিষ্ট কোনও উপাস্য দেবতা নেই। সে যে কোনও কারও
উপাসনা করতে পারে। সেটা একটি জড় বস্তু, প্রাণী, গাছপালা কিংবা মানুষও হতে পারে। অনেকে হয়ত এই কথা বলতে পারে, এতে সমস্যা কোথায়? হিন্দু ধর্ম যদি একজন
ব্যাক্তিকে নিজের ইচ্ছামতো যে কোনও বিষয়কে বা দেবদেবীকে উপাসনা করবার স্বাধীনতা
দিচ্ছে, এটা কি হিন্দু ধর্মের মহানতা নয়? এর উত্তর হল, না! মানুষের যে নিজের “ইচ্ছা
স্বাধীনতা” আছে, তা কোনও
ধর্ম, দর্শন, মতবাদ, বিশ্বাস বা কোনও দেশের আইনের কাছ থেকে পাওয়া নয়, বরং প্রতিটি মানুষ জন্ম থেকেই স্বাধীন সত্তা নিয়েই জন্মেছে।
প্রতিটি মানুষই
স্বভাবগত দিয়ে ও চেতনায় স্বাধীন। দ্বিতীয়ত, যদি একটি ধর্ম আমাকে নিজের ইচ্ছামতো যে কোনও বিষয়কে উপাসনা করবার
স্বাধীনতা দিচ্ছে, এর অর্থ হল, এই
ধর্ম ঈশ্বরের সন্ধান পাইনি, এই ধর্মের কাছে চূড়ান্ত সত্য
(Ultimate Truth) নেই। কারণ, একমাত্র
ঈশ্বর ছাড়া আর কেউই উপাস্য নয়। উপাসনা শুধুমাত্র তারই করা যায়, যিনি আমায় সৃষ্টি করেছেন, যার কাছে আমি আমার
অস্তিত্বের জন্য চিরকাল ঋণী। আমাদের এখানে বুঝতে হবে, যদি
একটা ধর্ম তার অনুগামীদের নিজের ইচ্ছামতো যে কোনও দেবতাকে বা বিষয়কে বেছে নিয়ে
উপাসনা করবার স্বাধীনতা দেয় এর মধ্যে আসল সমস্যা কোথায়?
ধরুন তিনজন হিন্দু
ব্যাক্তি আছে। একজন হিন্দু কৃষ্ণকে ভগবান বলে বিশ্বাস করে, আর একজন হিন্দু লোকনাথ বাবাকে ভগবান বলে
বিশ্বাস করে এবং অন্যজন রামকৃষ্ণকে ভগবান বলে বিশ্বাস করে। এখন ধর্মীয় পরিচয়ের দিক
দিয়ে এরা তিনজনেই কিন্তু নিজেদের হিন্দু বলে দাবী করে। এবার ধরুন এরা তিনজন এমন এক
মানুষের সঙ্গে ধর্মীয় আলোচনা করছে, যে জানতে চায় প্রকৃত
ভগবান আসলে কে? এখন স্বাভাবিক ভাবেই, যে হিন্দু কৃষ্ণকে ভগবান বলে বিশ্বাস করে, সে
ওই লোকটিকে বলবে, “কৃষ্ণই প্রকৃত ভগবান!”। কিন্তু অন্য
দুজন যারা লোকনাথ বাবা ও রামকৃষ্ণকে ভগবান বলেই বিশ্বাস করে, তারা কিন্তু সেটা মেনে নেবে না। তারা ওই লোকটির, মানে যে কৃষ্ণকেই ভগবান বলে বিশ্বাস করে, তার
সঙ্গে তর্ক শুরু করে দেবে। ফলে যে লোকটি “প্রকৃত ভগবান” আসলে কে সেটা জানতে এসেছিল,
সে বিভ্রান্ত হয়ে চলে যাবে, আর এও বুঝবে
যে, ওরা তিনজন হিন্দু হলেও ওদের মধ্যে মতের মিল নেই,
একতা নেই। এটা হল হিন্দু ধর্মের গভীর এক ফাটল, যার প্রতীকার সম্ভব নয়। এই সত্যিটা বুঝতে আমার যথেষ্ট সময় লেগেছে।
দুঃখের বিষয়, হিন্দুরা এই ব্যাপারটা নিয়ে ওত গভীর ভাবে
চিন্তা করে না। কারণ এটি একটি ধর্মীয় দর্শনের জ্ঞানতাত্ত্বিক সমস্যা।
একটি পরিবারের সদস্যরা
যদি ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুগামী হয়, তবে সেই পরিবারের মধ্যে শান্তি ও একতা থাকতে পারে না। তাদের মধ্যে
পারিবারিক সম্পর্ক যাই হোক না কেন। মানুষে মানুষে মনের মিল ও একতা থাকতে গেলে,
তাদের মতাদর্শ ও আন্তরিক বিশ্বাস এক হতে হবে। যখন মতাদর্শ ও
আন্তরিক বিশ্বাস এক হবে, তখন তাদের চিন্তা ধারাও এক হবে।
যখন চিন্তাধারা এক হবে, তখন লক্ষ্যগুলিও এক হবে। যখন
লক্ষ্যগুলি এক হবে, তখন সিধান্ত এক হবে। তখন তাদের সমস্ত
উদ্দেশ্য সফল হবে। হিন্দুধর্মের মধ্যে মৌলিক বিশ্বাস এবং গঠনমূলক শিক্ষা না থাকার
কারণে, হিন্দুদের জাতিগত একতা ও মনের মিল থাকা কোনও দিনই
সম্ভব হবে না।
৫. হিন্দু সমাজে হিন্দু
ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে, ধর্মীয় দর্শন এবং যুক্তিগত বিশ্লেষণের ব্যাপারে ব্যাপক মতভেদ
হিন্দুধর্মকে
সাধারণভাবে কয়েকটি প্রধান ধারায় ভাগ করা হয়। ঐতিহাসিকভাবে ছয়টি দর্শনে বিভক্তির
মধ্যে, বর্তমানে দুটি ধারা,
যেমনঃ বেদান্ত এবং যোগ, সবচেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ। হিন্দু দর্শনের ছয়টি আস্তিক ধারা রয়েছে, যা
বেদের কর্তৃত্বকে স্বীকৃতি দেয়, তা হল: সাংখ্য, যোগ, ন্যায়, বৈশেষিক,
মীমাংসা এবং বেদান্ত। আবার হিন্দু দর্শনের ওই ছয়টি আস্তিক ধারা
অনুযায়ী, হিন্দুধর্ম মোট চারটি প্রধান শাখায় বিভক্ত,
তা হলঃ বৈষ্ণবধর্ম (এখানে বিষ্ণুকেই প্রকৃত ঈশ্বর বলে উপাসনা করা
হয়), শৈবধর্ম (এখানে শিবকেই প্রকৃত ঈশ্বর বলে উপাসনা করা
হয় ), শক্তিধর্ম (এখানে নারী/দেবীকেই আদি শক্তি বলে
উপাসনা করা হয়) এবং স্মার্তধর্ম (এখানে সকল দেবতাকেই সমান উপাস্য হিসাবে পূজা করা
হয়)। স্মার্ত মতে বিশ্বাসী হিন্দুরা পাঁচটি দেবতা, অর্থাৎ,
বিষ্ণু, শিব, গণেশ,
সূর্য এবং শক্তিকে একই সঙ্গে সমান ভাবে পূজা করে থাকেন। এই
প্রথাটিকে সংস্কৃতে “পঞ্চায়তন পূজা” বলা হয়। এই
পূজার নিয়ম অনুযায়ী পাঁচটি দেবতার মূর্তি বা প্রতীককে একটি চক্রাকারে স্থাপন করা
হয়।
বলাই বাহুল্য, হিন্দু ধর্মের এই প্রধান চারটি শাখা, এদের ধর্মীয় দর্শন ও পূজন পদ্ধতিগুলি শাস্ত্র (বেদ) সম্মত নয়, বরং ওইসব মতের প্রবর্তক যারা, তাদেরই
ব্যাক্তিগত আবিষ্কার। এই প্রধান চারটি শাখার হিন্দুদের মধ্যে “মানুষের জীবনের মূল
উদ্দেশ্য” ঠিক কি, এ বিষয়ে কেউই নিশ্চিত ভাবে উত্তর দিতে
সক্ষম নয়। এদের প্রতিটি শাখা নিজের মতো করে তা ব্যাখ্যা করতে পারে, কিন্তু ওই বিষয়ে তারা কেউই পরস্পরের সঙ্গে একমত হতে পারে না। এটা একজন
ব্যাক্তিকে, যিনি ধর্মীয় দর্শনের মাধ্যমে মানব জীবনের
প্রকৃত উদ্দেশ্য অনুসন্ধান করছেন, তাকে বিভ্রান্তির পথে
ঠেলে দেয়।
৬. হিন্দু সমাজ পৃথিবীর
অন্যান্য সমাজ ব্যাবস্থার তুলনায় অনুন্নত ও পিছিয়ে
হিন্দুরা গর্বের সাথে এ
কথা দাবী করে যে, তাদের
ধর্ম পৃথিবীর সব থেকে প্রাচীন ধর্ম। কিন্তু এই কথাটি যদি সত্যি হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে হিন্দু সমাজব্যাবস্থা ও হিন্দুসমাজ জীবন পৃথিবীর
অন্যান্য ধর্মের সমাজব্যাবস্থার তুলনায় কেন অনুন্নত ও পিছিয়ে পড়া? এই প্রশ্নের উত্তরে সাধারণত একজন হিন্দু, ব্রিটিশ
ও মুঘল শাসকদের ঘাড়েই সমস্ত দোষ চাপিয়ে দেবে। সে বলবে, “ব্রিটিশ
আর মুঘলরা আমাদের দেশের সম্পদ লুটপাট করেছে, আমাদের দেশের
মূল্যবান নানা জিনিসপত্র নষ্ট করেছে, তাই ভারতের হিন্দু
সমাজজীবনের এই বেহাল অবস্থা”।
মানে মূল কথা হল, হিন্দুদের সমাজজীবনের বেহাল দশার জন্য “Colonialism”
বা “উপনিবেশবাদ” দায়ী।
কিন্তু বাস্তবে হিন্দুদের এই দাবী যুক্তিহীন ও মিথ্যা। কেন? কারণ এমন অনেক দেশ আছে, যেগুলি ভারতের মতই
ব্রিটিশ ও অন্যান্য বহিরাগত শাসকদের উপনিবেশবাদের শিকার হয়েছিল, তবে বর্তমানে তারা আজ ভারতের থেকে, শিক্ষা
ব্যবস্থা, তথ্য প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য
ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অনেক এগিয়ে, অনেক উন্নত।
তার কয়েকটি উদাহরণঃ
সিঙ্গাপুরঃ ১৯৬৩
খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ছিল, এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন কিছু সময়ের জন্য জাপানের অধীনেও ছিল।
বর্তমানে সিঙ্গাপুর পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশগুলির মধ্যে অন্যতম। ২০২৫ সালে, সিঙ্গাপুরের আনুমানিক মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ৯৪,০০০$ - ৯৫,০০০ $
ডলার।
দক্ষিণ কোরিয়াঃ দক্ষিণ
কোরিয়া ১৯১০ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত জাপানি ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে থাকার পর
যুদ্ধোত্তর ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বেরিয়ে এসে বর্তমানে একটি উচ্চ-তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক
অর্থনৈতিক শক্তিকেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যার মাথাপিছু জিডিপি ৩৫,০০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে
এবং এই দেশ সেমিকন্ডাক্টর ও অটোমোবাইলসের মতো শিল্প জগতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এছারাও
এই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় উচ্চ সাক্ষরতার হার (প্রায় ৯৮%) এবং গণিত ও বিজ্ঞানে
বিশ্বব্যাপী শীর্ষস্থানীয় অবস্থানের জন্য সুপরিচিত, যেখানে
সার্বজনীন শিক্ষা এবং বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণে ব্যাপক হারে বিনিয়োগ করা হয়েছে।
আয়ারল্যান্ডঃ ১৯২২ সালে স্বাধীন দেশে পরিণত হওয়ার আগে
পর্যন্ত শত শত বছর ধরে ব্রিটেনের ইংরেজ শাসকদের উপনিবেশ থাকা সত্ত্বেও, আজ আয়ারল্যান্ড মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ১০৯,০০০
ডলারে উন্নীত করেছে এবং নিম্ন করহার ও ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশের ও নীতিগুলির মাধ্যমে
গুগোল ও অ্যাপেলের মতো প্রযুক্তি দানবদের আকৃষ্ট করেছে। এই দেশ ইউরোপের অন্যতম
সর্বোচ্চ উচ্চশিক্ষা অর্জনের হার (৫০ শতাংশেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক) নিয়ে গর্ব করে,
যেখানে গুণমান ও উদ্ভাবনের উপর জোরালো গুরুত্ব দেওয়া হয়,
যা গড় আয়ু এবং জীবনযাত্রার মানের সূচকগুলিতে উন্নত ফলাফলের
দিকে পরিচালিত করে।
বতসোয়ানাঃ ১৯৬৬ সাল
পর্যন্ত ইংরেজ ব্রিটিশ সরকারের সংরক্ষিত অঞ্চল অধিকৃত থাকা বতসোয়ানা স্থিতিশীল
শাসনব্যবস্থা বজায় রেখেছে এবং হীরে উত্তোলন ও অর্থনীতির বহুমুখীকরণের মাধ্যমে
প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, যার
ফলে মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ৭,০০০ ডলারসহ দেশটি
উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। তবে এই দেশ শিক্ষাক্ষেত্রে প্রচুর বিনিয়োগ
করে (জিডিপির প্রায় ৯%), যার ফলে প্রাথমিক শিক্ষায়
প্রায় সর্বজনীন ভর্তি নিশ্চিত হয়েছে এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার সুযোগেরও উন্নতি
ঘটেছে, যা এটিকে সাব-সাহারান আফ্রিকার একটি ব্যতিক্রমী
দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
এইরকমের আরও কতগুলি দেশ
আছে, যে দেশগুলি বহিরাগত শাসক
শক্তির অধীনে থাকা সত্ত্বেও স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে সার্বিকভাবে উন্নতির শিখরে
পৌঁছেছে। তারা কিন্তু নিজেদের দেশের দুর্দশার জন্য সব দোষ “Colonialism”
বা “উপনিবেশবাদ” ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়নি। বরং তারা কঠিন জীবন সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে যেতে
দ্বিধাবোধ করেনি। তার সাথে সঠিক রাজনৈতিক সিধান্ত, সামাজিক
ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সঠিক নীতিমালাও স্থির করেছিল।
যে কেউ ভারতের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের শুরু থেকে নিয়ে
আজ অবধি যা কিছু ঘটেছে, তার কিছুমাত্র পড়াশুনা করেছে,
সে এ কথা জানবে, বর্তমান ভারতীয় জনগনের
বেহাল জীবন দশার জন্য আসলে অধিকাংশে ভারতীয়রাই দায়ী। এ কথা কজনে স্বীকার করবে?
আসলে ভারতীয়রা “ভিক্টিম মানসিকতা - (Victim
Mentality)” নিয়ে বেঁচে থাকতে সন্তোষ বোধ করে । এই
শ্রেণীর মানুষ যারা তারা কখনই নিজেদের দোষত্রুটি স্বীকার করে না, বরং অন্যের ওপরেই নিজের ব্যর্থতার দায় চাপিয়ে দিতে পারলে এরা বাঁচে।
ঠিক এই কারণেই ভারতের মধ্যে জ্যোতিষচর্চা, ভাগ্যগণনা ও
হস্তরেখা বিচারের মতো কুসংস্কার ও লোক ঠকানো ব্যাবসা ব্যাপক হারে দেখা যায়। কেন না
আমি যদি অসফল হই, আমি তার সমস্ত দায় গ্রহ নক্ষত্র আর
কপালের উপর চাপিয়ে দেব আর বলব, “আসলে সবই ভাগ্য!”।
৭. হিন্দু
ধর্মাবলম্বীরা শিক্ষার দিক দিয়ে অনেক বেশি পিছিয়ে
শিক্ষা কোনও জাতি বা
ধর্মের ব্যাক্তিগত সম্পত্তি নয়। অথচ যে জাতি নিজেদের প্রাচীন ও জ্ঞানী জাতি বলে
বিশ্বদরবারে পরিচয় দেয়, তাদের
শিক্ষার হার খুবই শোচনীয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরের বিভিন্ন সমীক্ষায় উঠে এসেছে,
হিন্দু সম্প্রদায় শিক্ষার দিকে দিয়ে পৃথিবীর অন্যান্য ধর্মীয়
গোষ্ঠীর থেকে অনেক বেশী পিছিয়ে । আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা পিউ রিসার্চ সেন্টারের
(Pew Research Center) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী, হিন্দুরা গড়ে ৫.৬ বছর বিদ্যালয়ের
পড়াশুনা করেছে এবং ৪১% হিন্দুদের কোনও রকমের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা (Formal
Education) হয়নি। আবার, মাত্র দশজনের
একজনেরই কলেজ ডিগ্রি আছে।
এখানেই শেষ নয়। গবেষণা
একথাও বলছে, হিন্দুদের মধ্যে
শিক্ষার ব্যাপারে লিঙ্গের ব্যবধান রয়েছে মারাত্মক, যা
অন্যান্য ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে একেবারেই নেই। শত শত বছর ধরে হিন্দু নারীদের
লেখাপড়া করতে দেওয়া হয়নি। অনেক অল্প বয়সেই হিন্দু মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হত। বিশ্বের
প্রায় ৫৩% হিন্দু মহিলাদের কোনও রকমের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা (Formal
Education) হয়নি।
বিশ্বের অধিকাংশ হিন্দু
ভারতে (৯৪%), নেপাল (২.৩%) এবং
বাংলাদেশের (১.২%) সীমান্তবর্তী দেশগুলিতে বাস করে। এই তিনটি দেশে হিন্দুদের
শিক্ষার হার কম; ভারতের হিন্দুরা গড়ে ৫.৩ বছর স্কুলে
পড়াশোনা করেছে, যেখানে নেপাল এবং বাংলাদেশে তারা গড়ে ৩.৯
এবং ৪.৬ বছর পড়াশুনা করেছে। তবে, এশিয়া-প্যাসিফিক
অঞ্চলের বাইরের খ্রীষ্টান প্রধান দেশগুলিতে, যেখানে
হিন্দুরা একটি ছোট ধর্মীয় সংখ্যালঘু, সেখানে তারা অনেক
বেশি উচ্চ শিক্ষিত হতে পেরেছে। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী হিন্দুরা ১৫.৭ বছর প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা করে [১]।
এটা হিন্দুদের কাছে বড়
লজ্জার বিষয়! হিন্দুরা যে পৃথিবীর অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের থেকে শিক্ষার দিক
দিয়ে এত পিছিয়ে, সে কথা পৃথিবীর
নামীদামী সব জার্নাল ও খবরের কাগজের পাতায় শিরনামে বড় বড় অক্ষরে ছাপা হয়েছিল।
প্রশ্ন ওঠে, হিন্দুদের এই অবস্থা কেন? এর জন্য কে বা কারা দায়ী? হিন্দু জাতির ইতিহাস
ঘাঁটলে জানা যায়, হিন্দুরা সেই প্রথম থেকেই আনুষ্ঠানিক
শিক্ষার দিকে কোনও দিনও মনোযোগ দেয়নি। আগ্রহও ছিল না। তাদের কাছে মূল শিক্ষা বলতে
ছিল ধর্মীয় শিক্ষা, বা বেদ পাঠ। তা আবার বিশেষ ভাবে
পুরুষদেরই জন্য, নারীদের জন্য নয়। যদিও হিন্দুদের একাংশ এ
কথা দাবী করে, হিন্দুরা নাকি প্রাচীন কালে খুবই
জ্ঞানীগুণী পণ্ডিত জাতি ছিল। তারা নাকি বিভিন্ন বিষয়ের উপরেই পাণ্ডিত্য ও জ্ঞান
অর্জন করেছিল। কিন্তু সেই জ্ঞান ও পাণ্ডিত্য বর্তমান হিন্দু সমাজে কেন দেখা যায়না?
এখানেও হিন্দুরা ইংরেজ আর মুঘলদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দেবে।
খোঁজ নিয়ে দেখবেন, ভারতের যে কোনও রাজ্যে, যে কোনও জেলায়, সবচেয়ে উন্নতমানের বিদ্যালয়
যদি কিছু থেকে থাকে, তবে সেটা হবে কোনও খ্রীষ্টান
পরিচালিত বিদ্যালয় বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (Convent & Missionary)। এমনটা নয় যে ভারতের বুকে হিন্দু পরিচালিত
কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। কিন্তু হিন্দু মা বাবারা তাদের সন্তানদের উজ্জ্বল
ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাদের সন্তানদের খ্রীষ্টান স্কুলে ভর্তি করাটাকেই সঠিক
সিধান্তরুপে বিবেচনা করে। নিজেদের সরকার পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপরে
হিন্দুদের তেমন একটা আস্থা নেই।
সম্পূর্ণ ভারতের
শিক্ষার মেরুদণ্ড শক্ত হাতে ধরে রয়েছে ভারতের খ্রীষ্টানরা! এই চরম সত্যিটা
হিন্দুদের কাছে অসহনীয় লাগলেও, দীর্ঘশ্বাস ফেলে এটা মেনে নেওয়া ছাড়া হিন্দুদের কাছে আর অন্য কোনও
রাস্তা নেই। ভারত সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারতের
খ্রীষ্টান মিশনারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি, ভিন্ন ভিন্ন
সম্প্রদায় ও ধর্মের ছেলেমেয়েদের শিক্ষা প্রদান করে, যেখানে
প্রায় ৭৪% থেকে ৮০% শিক্ষার্থীই অখ্রিস্টান পরিবার থেকে আসে এবং এদের মধ্যে প্রায়
৬০% বেশী হল হিন্দু। সেই একই তথ্য অনুযায়ী, ভারতে ৫০,০০০ থেকে ৫৫,০০০ এরও বেশি খ্রীষ্টান স্কুল
রয়েছে, যেখানে আড়াই কোটিরও বেশি শিক্ষার্থী পড়াশুনা করে
[২]। এক কথায় বললে, ভারতের হিন্দুরা খ্রীষ্টানদের কাছে
ঋণী।
৮. হিন্দু সমাজে
জাতিভেদ ও ভাষা নিয়ে বৈষম্য এবং দ্বন্দ্ব
হিন্দু সমাজ ব্যাবস্থার
একটি অপরিহার্য অঙ্গ হল জাতিভেদ (Casteism)। জাতিভেদ ও হিন্দুধর্ম, এই দুটিকে ভিন্ন চোখে দেখা সম্ভব নয়।
হিন্দুধর্ম মানেই জাতিভেদ, আর জাতিভেদ মানেই হিন্দুধর্ম।
কিন্তু জাতিভেদ বা Casteism আসলে কী? এর ভূমিকা কী?
সহজ ভাবে বললে, জাতিভেদ হল নিজ বর্ণ ও জাতির প্রতি তীব্র,
অন্ধ আনুগত্যের অনুশীলন, অনমনীয়
বিশ্বাস, যা বংশগত সামাজিক স্তরবিন্যাসের ভিত্তিতে অন্য
জাতি ও বর্ণের মানুষকে নিকৃষ্ট বলে গণ্য করা। হিন্দুধর্মের সামাজিক শ্রেণীবিন্যাস
মধ্যে এটি প্রোথিত, এটি নিম্নবর্ণের ব্যক্তিদের সামাজিক,
অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে বর্জন করে, যা
সমতা ও ন্যায়বিচারের নীতি লঙ্ঘন করে।
গীতার অধ্যায় ৪:১৩ এবং
১৮:৪১ এ উল্লেখ আছে, কৃষ্ণ
মানব সমাজকে চারটি শ্রেণীতে বিভাজিত করেছেন (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়,
বৈশ্য ও শূদ্র) এবং তিনি এটা করেছেন মানুষের “গুণ ও কর্মের” উপর
ভিত্তি করে। গীতায় বিশ্বাসী হিন্দুরা একে “বর্ণাশ্রম ব্যবস্থা” বলে ডাকেন। তারা এই
ব্যবস্থাকে জাতিভেদ বলে ডাকতে পছন্ধ করেন না। তবে তারা পছন্দ করুন আর নাই করুন,
এটাই যে আসলে জাতিভেদ প্রথা এ কথা মানুষ বোঝে। ভগবত গীতার এই
অংশটি এতটাই বিতর্কিত যে, গীতার প্রচারকেরা এই বিষয় নিয়ে
মানুষের সাথে কথা বলতে চান না এবং অধিকাংশ সময়েই এই প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান।
ঋগ্বেদের পুরুষসূক্ত
স্তোত্রে (মন্ডল ১০, স্তোত্র
৯০, শ্লোক ১২) বলা হয়েছেঃ “ব্রাহ্মণ (ভগবানের প্রতিনিধি)
সৃষ্টি হয়েছে ভগবানের মুখ থেকে, ক্ষত্রিয় (শাসক/যোদ্ধা)
সৃষ্টি হয়েছে ভগবানের বাহু থেকে, বৈশ্য (বণিক) সৃষ্টি
হয়েছে ভগবানের উরু থেকে, এবং ভগবানের পা থেকে শূদ্র
(শ্রমিক) সৃষ্টি হয়েছে।”
সহজেই অনুমান করা যায়, হিন্দু সমাজে শূদ্রদের কী চোখে দেখা হয়!
হিন্দুধর্ম অনুযায়ী শূদ্ররা নিচু জাতের লোক। শূদ্রদের ছোটলোক, চামার ইত্যাদি নামে সম্বোধন করা হয়। তাদের সাথে এমনই অমানবিক আচরণ করা
হয়, যেন তারা মানুষ নয়। প্রায় হাজার বছর ধরে, উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ জাতি শূদ্রদের উপর অত্যাচার করে আসছে। ভারতীয়
হিন্দু সমাজ বলতে ব্রাহ্মণদেরই বোঝাত। কে কী খাবে, কে কী
পড়বে, কে কাকে বিয়ে করবে, কে
কেমন ভাবে বাঁচবে; এই সমস্ত ব্যাপারে ব্রাহ্মণদের নিয়ম
চলত। ব্রাহ্মণদের অমান্য করা মানে, ভগবান ও বেদকে অমান্য
করার সমান।
ডঃ বি.আর. আম্বেদকর
হিন্দুধর্মে প্রচলিত জাতিভেদ ও বর্ণপ্রথার একজন তীব্র সমালোচক ছিলেন, তিনি এটিকে কেবল শ্রমের সামাজিক বিভাজন
হিসেবেই নয়, বরং জন্মের উপর ভিত্তি করে একটি অনমনীয়
শ্রেণিবিন্যাস তৈরি করে এমন একটি অপ্রাকৃতিক “শ্রমিকদের বিভাজন” হিসেবেও
দেখেছিলেন। তিনি যুক্তি দিয়েছেন, বর্ণপ্রথা মানুষের
চেতনাকে ধ্বংস করে, মানবাধিকার অস্বীকার করে এবং জাতীয়
ঐক্যকে নষ্ট করে।
তাঁর মূল গ্রন্থ
অ্যানিহিলেশন অফ কাস্ট (১৯৩৬) -এ, আম্বেদকর যুক্তি দিয়েছেন, বর্ণপ্রথা সংস্কার
করা অসম্ভব কারণ এটি হিন্দুধর্মের ধর্মীয় গ্রন্থগুলিতে গভীরভাবে লেখা হয়েছে। তিনি
জোর দিয়ে বলেছেন যে এর একমাত্র সমাধান হল বর্ণপ্রথা এবং এর ভিত্তি সমূলে “ধ্বংস”
করতে হবে। আম্বেদকর বিশ্বাস করতেন, বর্ণপ্রথা হিন্দু
ধর্মীয় গ্রন্থ, বিশেষ করে মনুস্মৃতি দ্বারা পবিত্র ও
অনুমোদিত করা হয়েছে। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে বর্ণপ্রথা ও জাতিভেদ ধ্বংস করতে
হলে, বৈষম্য প্রচারকারী শাস্ত্রের ঐশ্বরিক কর্তৃত্বকে
বর্জন করতে হবে।
হিন্দুধর্মের মধ্যে
শূদ্ররা কখনই সমান অধিকার ও সম্মান অর্জন করতে পারবে না, এ কথা জেনেই তিনি তাদের হিন্দুধর্ম ত্যাগ
করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। ১৯৫৬ সালে, তিনি নিজে বৌদ্ধ
ধর্মে গণ-ধর্মান্তরের নেতৃত্ব দেন। বৌদ্ধধর্মকে আম্বেদকর সমতা, করুণা এবং যুক্তিবাদের একটি ধর্ম হিসেবে দেখতেন। পরবর্তী সময়ে ভারতীয়
সমাজে শূদ্রদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য আম্বেদকার আইনসভা এবং সরকারি
চাকরিতে সংরক্ষিত আসন সহ সাংবিধানিক নানা সুরক্ষার জন্য লড়াই করেছিলেন।
এখানেই শেষ নয়! জাতপাত
ও বর্ণবৈষম্যের পাশাপাশি হিন্দুসমাজে ভাষা নিয়েও ব্যাপক বৈষম্য বিদ্যমান। ভারতে
ভাষার বৈষম্য একটি জটিল মনোভাব, যা আঞ্চলিক ভাষা, হিন্দি এবং ইংরেজি ভাষার
মধ্যে মিথস্ক্রিয়া থেকে উৎপন্ন হয়, এর কারণে কর্মসংস্থান,
শিক্ষা এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকে দারুণ ভাবে প্রভাবিত করে। মূল
দ্বন্দ্বগুলির মধ্যে রয়েছে অহিন্দি ভাষাভাষী ব্যক্তিদের উপর জোর করে হিন্দি
চাপিয়ে দেওয়া, বেসরকারি কর্মপ্রতিষ্ঠানগুলিতে ইংরেজির
আধিপত্য, এবং ভাষার দক্ষতার ভিত্তিতে ভিন রাজ্য থেকে
জীবন-জীবিকা ধারণ করতে আসা মানুষের সাথে স্থানীয় অধিবাসীদের বৈষম্যমূলক আচরণ।
পশ্চিমবাংলা থেকে যে সকল বাঙালি শ্রমিক কর্মসংস্থানের জন্য ভিন রাজ্যে যায়,
তাদের সাথে প্রায়ই অমানবিক আচরণ করা হয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে আবার
পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের বাংলাদেশী বলে সম্বোধন করা। এমনকি মারধর পর্যন্ত করা হয়।
ইউটিউব এবং গুগোলে একটু সার্চ করলেই দেখতে পাবেন।
আমার প্রশ্ন, যে দেশের অধিকাংশ অধিবাসী নিজেদের
হিন্দুধর্মের অনুসারী বলে পরিচয় দেয় তাদের মধ্যে সব ব্যাপারেই এত বৈষম্য ও ভেদাভেদ
কেন? তাদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি স্রদ্ধা, সহিষ্ণুতা ও একতার অভাব কেন? এর উত্তর আপনার
যদি না জানা থাকে, তাহলে তা খুবই দুঃখের বিষয়! আমি এর
কারণ, এর উত্তর জানি। তবে এখানে সেই উত্তর সরাসরি নিয়ে
দিয়ে এটাই বলবো যে, হিন্দুধর্ম ঈশ্বরের থেকে উদ্ভূত হওয়া
কোনও ধর্ম নয়, বরং এটি ভৌগোলিক এবং আঞ্চলিক পরিচয় বহন
করবার একটি নাম মাত্র [৩]।
৯. হিন্দু
ধর্মাবলম্বীদের দুমুখি জীবন যাপন
আমি এবং আমার পরিবার যে
গুরুর দীক্ষিত ছিলাম, প্রতি
মাসে তার সৎসঙ্গ কিংবা ধর্মসভা কোনও না কোনও দীক্ষিত ব্যাক্তির বাড়িতে অনুষ্ঠিত
হত। সেই অনুষ্ঠানে ও ধর্মসভায় অনেক মানুষই আসতেন ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক আলোচনা
শুনতে। যার বাড়িতে ওইসবের আয়োজন হত, তার উপর খরচার সমস্ত
ভার পড়ত। সৎসঙ্গের নাম করে চলতো ভুরিভোজ। গুরুর যে সকল ঋত্বিকরা ধর্মীয় কথা আলোচনা
করে শিষ্যদের উদ্দীপ্ত করতেন, তারা বেশ ভাল টাকাকড়ি
লোকদের কাছ থেকে উপায় করে নিতেন। তারা কারও আর্থিক পরিস্থিতির কথা ভেবে দেখতেন না।
কেউ যদি সময় মতো দান দক্ষিণা দিতে ব্যর্থ হত, তাকে
রীতিমতো নানা অমঙ্গলের কথা শোনানো হত।
একবার আমাদের এলাকায় ঐ
ধর্মীয় সম্প্রদায়ের এক ঋত্বিক একজনের বাড়িতে যায় ঠাকুরের নামকীর্তন শোনাতে। এমনিতে
হিন্দুদের মধ্যে ভক্তিভাব একটু বেশী। তার উপর ঠাকুর দেবতার ব্যাপারে কেউ কিছু বললে
তারা আগ্রহ দিয়ে শোনে। এখন যে বাড়িতে ঐ ঋত্বিক গিয়েছিলেন, সেই বাড়িতে ছিল এক গর্ভবতী মহিলা। সে কথা
জানতে পেরে, ঋত্বিক ঐ মহিলাকে পরামর্শ দেয় যথা শিগগির
গুরুর দীক্ষা নিতে, নাতো তার গর্ভের সন্তান বিকলাঙ্গ হয়ে
জন্মাতে পারে। এইসব কথা শুনে সেই মহিলা বিচলিত হয়ে ওঠে।
ভাবি সন্তানের অমঙ্গল
ঠেকাতে ঠাকুরের দীক্ষা নেওয়া উচিত বটে। বাড়ি ফিরে সেই মহিলার স্বামী যখন সমস্ত
ব্যাপার জানতে পারে, তখন
সে তো রেগে আগুন! কিছুদিনের মধ্যেই সেই ঋত্বিক যখন মনের আনন্দে গুরুর দীক্ষা দেবে
বলে ঐ বাড়িতে যায়, তখন সেই মহিলার স্বামী আর পাড়ার
বেশকিছু লোকেরা মিলে তাকে বিশেষ খাতির যত্ন দিয়ে ধন্য করে। সেদিনের পর থেকে ঐ
ঋত্বিককে আমাদের এলাকায় আর কোনদিনও দেখা যায়নি।
পরবর্তীকালে জেনেছিলাম, যারা ঐ সম্প্রদায়ের ঋত্বিক হয়, ঠিক কত মানুষকে প্রতি মাসে ও প্রতি বছরে দীক্ষা দিতে হবে তার একটা
লক্ষ্য (Target) স্থির করে দেওয়া হয়। একজনের ঋত্বিকের
আর্থিক উপার্জন নির্ভর করে সে যে সকল মানুষকে দীক্ষা দিয়েছে, তাদের দান দক্ষিণার লভ্যাংশয়ের উপর। কারণ মূল টাকা, আগে সেই সম্প্রদায়ের বড় অফিসে যাবে। সেখানে খোঁজ নিয়ে দেখা হবে,
যারা দান পাঠিয়েছে তারা কোন ঋত্বিকের হাতে দীক্ষিত। তারপর সেই
ঋত্বিকের হাতে হিসেব অনুযায়ী কিছু টাকা পয়সা আসবে। বর্তমানে ঐ সম্প্রদায়ের কারনে
হিন্দুদের একটা বড় অংশ বেশ ক্ষিপ্ত হয়ে আছে। অবশ্য এতে তাদের কিছুই যায় আসে না।
এদের শিষ্য সংখ্যা লক্ষ ছাড়িয়ে। এদের মধ্যে অনেকেই আবার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক
ব্যাক্তি। মোটামুটি এই সম্প্রদায়ের বেশ শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে।
হিন্দু সমাজের মধ্যে
ধর্মীয় মূল্যায়ন নেই। মানে যে কেউ এসে নিজেকে ভগবান, দেবতা বা দৈব শক্তির অধিকারী গুরু বলে দাবী করতে পারে। এমন ঘটনা অনেক
আছে। আমার ব্যাক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, হিন্দু
সম্প্রদায়কে ধর্মীয় আবেগ দিয়ে ঠকানো জলের মতোই সরল। এর মূল কারণ হল, হিন্দুরা হয়তো গীতায় বা অন্যান্য শাস্ত্রে কী বলা হয়েছে তা নিয়ে অনেক
কথা বললেও নিজেরা কিন্তু তার এক অক্ষরও মানে না।
আমি হিন্দু বাড়িতে
জন্মেও একজনকেও আজও অবধি হিন্দু শাস্ত্র মেনে চলতে দেখিনি। কিন্তু শাস্ত্র অনুযায়ী
হিন্দুদের যা করতে নেই, তা
করতে দেখেছি। তারা বলে একরকম, আর করে আরেকরকম। যদি কোনও
হিন্দুকে এ প্রশ্ন করা হয়, সে কোন শাস্ত্র সঠিক ভাবে মেনে
চলে, সে তার উত্তর দিতে পারবে না! বা যদি প্রশ্ন করা হয়,
সে কোন শাস্ত্র সম্পূর্ণরূপে পাঠ করেছে, উত্তর আসবে হতাশাজনক।
আমি নামীদামী অনেক
হিন্দুদের দেখেছি খ্রীষ্টধর্মের, খ্রীষ্টমণ্ডলীর ও খ্রীষ্টানদের সমালোচনা করতে। খ্রীষ্টানদের দোষত্রুটি
নিয়ে আঙুল তুলে বিস্তর তালিকা সাজিয়ে কথা বলতেও শুনেছি। কিন্তু সম্পূর্ণ
হিন্দুধর্মের মধ্যে যে পরিমাণ ভণ্ডামি আর কুকর্মের ভাণ্ডার রয়েছে, তা নিয়ে সেই সব মানুষকে একটাও কথা বলতে দেখিনি। অন্যের দোষত্রুটি ধরার
আগে, আমাকে আগে নিজের দিকে তাকানো উচিত, আমি কতটা নির্ভুল ও সৎ।
হিন্দুধর্ম যে একমাত্র
সত্য সনাতন ধর্ম ও প্রাচীনতম ধর্ম, এ কথা তো হিন্দুরা নিজেরাই বার বার বলতে থাকে। তাহলে তাদের দাবী
অনুযায়ী, হিন্দুজাতির মধ্যে কোনও প্রকারের ভ্রান্তি,
বিকার, অশিক্ষা কিংবা বৈশিষ্ট্যগত
দোষত্রুটি থাকাটা উচিত নয়। কিন্তু আমরা সকলেই জানি সমগ্র হিন্দু জাতির অবস্থাটা
কী। যারা ভগবত কথা প্রচার করেন, তারা মানুষকে নির্লিপ্ত
হতে উপদেশ দেন। তারা বলে থাকেন, সাংসারিক বা জাগতিক
বস্তুর ওপরে মায়া করতে নেই। তাহলে আত্মার মুক্তি সাধন হয়না। অথচ তারা নিজেরাই দামী
ফোন ব্যাবহার করেন, বিলাসবহুল গাড়িতে চড়েন, নামীদামী ব্র্যান্ডের জামাকাপড় পড়েন। এনাদের অনেকের কোটি কোটি টাকার
সম্পত্তি রয়েছে! কত মন্দির কত আশ্রম আর্থিক ও যৌন কেলেঙ্কারিতে খবরের শিরোনামে
নিজেদের নাম লিখিয়েছে, তার হিসেব কতজনে রেখেছে? তবে অন্য ধর্ম নিয়ে সমালোচনা কেন?
আসল কথা, হিন্দুজাতির কাছে ধর্ম হচ্ছে একটা সামাজিক,
রাজনৈতিক ও ভৌগলিক পরিচয়। এরা আদৌ ঈশ্বর প্রেমী নয়। ঠিক এই
কারণেই ভারতীয় রাজনীতির মূল আলোচনায় সবসময় ধর্ম উঠে আসে। এখানে ধর্মের রাজনীতি হয়।
যারা ধর্মের রাজনীতি করে, তারা এ কথা ভাল ভাবেই জানে,
ভারতীয় হিন্দুরা ধর্মীয় আবেগে পরিপূর্ণ। তারা ধর্মের কথা বলে বটে,
কিন্তু ধর্ম অনুযায়ী চলে না। বোধহয়, এটাই
কারণ, হিন্দুজাতি কোনদিনও স্বতন্ত্র এক জাতি হিসেবে মাথা
তুলে দাঁড়াতে পারবে না।
১০. হিন্দু সমাজে
ধর্মীয় কুসংস্কার ও বিভিন্ন অন্ধ বিশ্বাস
এই জাতির লোকজন যে কি
পরিমাণ কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকে তা নিয়ে বিস্তারিত ভাবে লেখা
নিষ্প্রয়োজন। যে কোনও ধর্মের মানুষের পক্ষে ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করাটা
স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু যদি এক ধর্মের মানুষ তন্ত্রমন্ত্র, কালাজাদু, বশীকরণ
এবং ঝাড়ফুঁকে বিশ্বাস রেখে চলে, তাহলে বুঝতে হবে তাদের
উপাস্য ভগবান দুর্বল এবং সর্বশক্তিমান নয়।
আমি হিন্দুদের মধ্যে এই
ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছি। ধরা যাক, তাদের মনের মতো কোনও কাজ হচ্ছে না, কারও হয়তো
চাকরি হচ্ছে, কারও বা বিয়ে হচ্ছে না, কারও আবার ব্যাবসায় লোকসান হচ্ছে, তারা ভেবে
নেয় নিশ্চয়ই কেউ তাদের উপরে কালাজাদু করেছে। তখন তারাও আবার পাল্টা কালাযাদু করবার
জন্য বিভিন্ন জায়াগায় ছোটে। আমার প্রশ্ন হল, যদি
হিন্দুদের দাবী অনুযায়ী তাদের ভগবান শক্তিশালী হয় এবং তিনিই যদি কেবল তাদের সকল
অমঙ্গল থেকে রক্ষা করতে পারেন, তবে তারা কালাজাদুকে কেন
ভয় পাবে? তারা কেনই বা কালাজাদু করতে যাবে, যেখানে তারা তাদের ভগবানের কাছে প্রার্থনা করলেই জীবনে ভাল ভাল জিনিস
পেতে পারে? কিন্তু তারা এমনটি করবে না। কারণ তাদের প্রকৃত
ঈশ্বর জ্ঞান নেই। তারা যদি এই বিষয় নিয়ে একটু তলিয়ে দেখতো, তাহলে তারা বুঝতো, একজন প্রকৃত ঈশ্বর বিশ্বাসী
মানুষের জন্য অন্য কোনও বাহ্যিক শক্তি বা মতবাদের প্রয়োজন হয়না। হিন্দুরা এইসব
কালাজাদু, ঝাড়ফুঁক বা বশীকরণের পিছনে প্রচুর টাকা খরচা
করে। কিন্তু এত কিছুর পরেও হিন্দুজাতি অন্যান্য জাতির চাইতে দুর্বল।
১১. হিন্দুধর্মে নারীর
সামাজিক অবস্থা অত্যন্ত নিম্ন মানের
পৃথিবীর মধ্যে ভারত
একমাত্র দেশ, যে কিনা নারীকে দেবী
রুপে পূজা করে বলে উচ্ছ্বসিত থাকে। মোটামুটি সারা বছরই ভারতে কোনও না কোনও দেবীর
পূজা হয়ে থাকে। দুর্গা, সরস্বতী, কালী বা লক্ষ্মী তাদের মধ্যে জনপ্রিয়। তবে সত্য এই, ভারতে যে পরিমাণ নারীর অসম্মান বা নির্যাতন হয়, তা আর অন্য কোনও দেশে হয় বলে মনে হয় না।
ভারতীয় কেন্দ্রীয়
সংস্থা, ন্যাশনাল ক্রাইম
রেকর্ডস ব্যুরোর (NCRB)
২০২১ সালের দেওয়া রিপোর্ট
অনুসারে, গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৮৬ জন মহিলা ধর্ষিত হয় [৪]।
প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ৪৯টি অপরাধ করা হয় নারীদের প্রতি। নারীদের প্রতি সহিংসতা ও
অপরাধের তালিকায় সবার উপরে রয়েছে রাজস্থান, তারপরের
স্থানে রয়েছে যথাক্রমেঃ মধ্য প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, উত্তর প্রদেশ এবং দিল্লী। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী,
ধর্ষণ ও অন্যান্য নারী সংক্রান্ত অপরাদের দিক দিয়ে ভারত সবসময়
১-৩ স্থানে বিরাজ করে এবং নারীদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক দেশগুলির মধ্যে অন্যতম হল
ভারত, তারপরেই আছে আফগানিস্থান।
অন্যদিকে ডেনমার্ক, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড
এবং বেলজিয়ামের মতো ইউরোপের খ্রীষ্টান দেশগুলি নারীদের জন্য সবচেয়ে সুরক্ষিত দেশ
বলে বিবেচিত হয়েছে [৫]। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের দিক দিয়ে বিবেচনা করলে বোঝা যায়,
নারীদের প্রতি হিংসা ও নানা ধরণের অত্যাচারে হিন্দু ও মুসলিম
সমাজেরই নাম বারে বারে উঠে আসে। সারা বিশ্বে নারীদের সাথে যে সকল অপরাধ ঘটে থাকে,
যারা সেই অপরাধ ঘটায়, তাদের ধর্মীয়
পরিচয় ও সাংস্কৃতিক পটভূমি দেখলে সে কথা স্পষ্ট প্রমাণ হয়ে যায়। অনেকে এ কথা বলতে
পারে, অন্যান্য অনেক দেশেই তো নারী নির্যাতন, ধর্ষণ হয়, তাহলে ভারতের নাম বা হিন্দুদের নাম
এখানে বড় করে দেখানো কী উচিত কাজ? আমার উত্তর হবে,
ভারত যেহেতু একমাত্র দেশ যে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ভাবে নারীকে
‘আদি শক্তি’ বা ‘দেবী রুপে’ পূজা করে, সম্মান করে বলে
আন্তর্জাতিক স্তরে দাবী করে, তাই সে অপরাধী বা মিথ্যাবাদী
বলেই গণ্য হবে। কারণ যে যা দাবী করে, তাকে সে অনুযায়ী কাজ
করতে হয়।
১২. হিন্দুধর্মে কন্যা
ভ্রূণ হত্যা ও অধিক পুত্র সন্তানের কামনা
সন্তান ঈশ্বরের দান।
কিন্তু হিন্দু সমাজে পুত্র সন্তান হল দান আর কন্যা সন্তান ঘাড়ের বোঝা। বড় হয়ে
মায়ের কাছে জেনেছিলাম, আমার
বাবা আর ঠাকুমা, দুজনেই আমার বোনকে গর্ভে থাকার সময় নষ্ট
করে দিতে চেয়েছিল। কারণ জানতে মা আমায় বলে, “মেয়ে বলে
তাই!”। ভাবতাম, ওরা মানুষগুলো খারাপ। বয়স বাড়ার সাথে সাথে
বুঝলাম হিন্দু সমাজের বেশীরভাগ মানুষগুলোই আসলে ওইরকমের। হিন্দু সমাজে যে পুত্র
সন্তানই অধিকভাবে কাম্য, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
আমি হিন্দু ধর্মের যে
সকল শাস্ত্র ও বইপত্র পড়েছি, সেখানেই প্রমাণ পাই কেন হিন্দু সমাজে সন্তান কামনার ক্ষেত্রে লিঙ্গ
বৈষম্যের মানসিকতা রয়েছে। এই মানসিকতা হিন্দুদের মধ্যে এমন এক বিষাক্ত বীজ বপন
করেছে যে, কন্যা সন্তান জন্ম দেওয়ার অপরাধে কত গৃহবধূকে
ঘরসংসার ছাড়তে হয়েছে, কতজনকে শ্বশুরবাড়ির অত্যাচার পেতে
হয়েছে আর কতজনকে তো নিজেদের প্রাণ হারাতে হয়েছে। তারপরেও হিন্দুরা নিজেদের ধর্ম ও
সংস্কৃতি নিয়ে গর্ব বোধ করে! পিউ রিসার্চ সেন্টারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে লিঙ্গ নির্বাচন ও পুত্র সন্তানের কামনায়
ভারতে প্রায় ৯০ লক্ষ কন্যাভ্রূণ হত্যা করা হয়েছে। অনেক সময় কন্যা সন্তান জন্মানোর
পর সদ্যজাত শিশুকে জঞ্জাল আবর্জনায় ফেলে দেওয়া হয়েছে।
২০২০ সালে জাতিসংঘের
জনগণনা তহবিলের (UNFPA) একটি তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা পুত্রসন্তান
কামনায় লিঙ্গ নির্বাচনের পদ্ধতি অবলম্বন করে জন্মের আগে গর্ভপাতের দ্বারা এবং
জন্মের পরে অন্য উপায়ে প্রায় ৪৫ লক্ষ কন্যা সন্তান হত্যা করেছে [৬]। ২০১৯ সালে
ভারত সরকারের কাছে এক চাঞ্চল্যকর ব্যাপার ধরা পড়ে। তারা জানতে পারে, উত্তরাখণ্ড রাজ্যের উত্তরকাশী জেলার যে ৫০০টি গ্রামে ৯৪৭টি শিশুর জন্ম হয়েছে,
তার মধ্যে ১৩২টি গ্রামে তিন মাসে একটিও কন্যা সন্তান জন্মায়নি [৭][৮]।
হিন্দু সমাজের মধ্যে
থাকা ধর্মীয় শিক্ষা এবং নারীর প্রতি যৌতুক-সম্পর্কিত আর্থিক চাপ, অবৈধ লিঙ্গ
নির্ধারণের মাধ্যমে পুত্র সন্তান বেছে নেওয়ার পছন্দকে বেশী গুরুত্ব দিয়েছে। অনেকে
প্রশ্ন করতে পারে, সরকার এ ব্যাপারে কেন কোনও শক্ত
পদক্ষেপ নিচ্ছে না? প্রকৃতপক্ষে, ১৯৯৪ সালে প্রি-কনসেপশন
অ্যান্ড প্রি-নেটাল ডায়াগনস্টিক টেকনিকস (PCPNDT) আইন, লিঙ্গ নির্ধারণ নিষিদ্ধ করার জন্য প্রণীত হয়েছিল, কিন্তু ভারতে পুত্রসন্তানের উচ্চ চাহিদার কারণে এর বাস্তবায়ন এখনও প্রশ্নের
মুখে।
এর সাথে অবশ্য বেসরকারি
অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্র জড়িত আছে যারা আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যানিং এর মাধ্যমে অবৈধ লিঙ্গ নির্ধারণের সুযোগ করে দিয়েছে।
এমনকি অনেক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীরাও গোপনে এই অনৈতিক কাজের সাথে যুক্ত রয়েছে।
অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনের তাগিদে তারা এই কাজ করে থাকে। তবে এটা বললেই ভুল হবে না
যে, তারা নিজেরাও সম্ভবত একই মানসিকতা বহন করে। কারণ
তাদের অধিকাংশই যে হিন্দু সমাজ থেকেই আসে।
১৩. হিন্দুধর্মে
প্রচলিত “ভগবানের” ঐতিহাসিক অস্তিত্বের প্রমাণ নেই
যখন কেউ হিন্দু ধর্মের
কথা বলে, তখন মানুষের মনে নানা
দেবদেবীর কল্পকাহিনী ভেসে ওঠে। হিন্দুধর্মে পূজিত যে সকল দেবদেবীর উল্লেখ পাওয়া
যায়, তাদের কথা আমরা পুরাণের বিভিন্ন গ্রন্থে পেয়ে থাকি।
এই সকল কাহিনীকে পৌরাণিক কাহিনী বা ইংরেজিতে Mytholgy বলা
হয়। আমরা অন্যান্য বহু সভ্যতার মধ্যেই পৌরাণিক কাহিনী দেখতে পাই। পৌরাণিক কাহিনী
একটি সভ্যতার সামাজিক বিবর্তন, সাংস্কৃতিক পরিবেশ,
সামাজিক পরিকাঠামো এবং মূল মূল্যবোধের প্রতিফলন হিসেবে কাজ করে।
তবে তার অর্থ এই নয় যে, পৌরাণিক কাহিনী ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে
সত্যরূপে গ্রহণযোগ্য! যেমন, হিন্দুধর্মে পূজিত কৃষ্ণ বা
রাম। এঁরা কেউই কিন্তু ঐতিহাসিক ব্যাক্তি নন। এঁদের বিষয়ে নানা পুঁথিপত্র লেখা আছে,
নানা কাহিনী রচিত আছে, তবে তার কোনকিছুই
বাস্তব নয়। ভারতের ইতিহাসবিদরা তাই এনাদের নিয়ে কোনও তথ্যপ্রমাণ দিতে পারেননি।
এটাই কারণ ভারতের সরকারী বিদ্যালয়ের ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তকে কৃষ্ণ বা রাম, এনাদের কারও নামই উল্লেখ নেই। অথচ যীশু খ্রীষ্ট, গৌতম বুদ্ধ কিংবা গুরু নানকের নাম উল্লেখ আছে। কেন? কারণ এঁরা ঐতিহাসিক ব্যাক্তি, কাল্পনিক চরিত্র
নন।
অবশ্য হিন্দুদের মধ্যে
একটি অংশ রাম ও কৃষ্ণকে ঐতিহাসিক ব্যাক্তি বলেই মনে করে থাকে। তাদের যুক্তি, হিন্দু পৌরাণিক কাহিনীতে যে সকল স্থানের
উল্লেখ আছে, ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ববিদরা নাকি সেই সকল
স্থানের হদিস পেয়েছেন। কিছু কিছু নগরী পাওয়া গেছে যা নাকি এখন জলার তলায় আছে। তারা
মনে করে এটাই প্রমাণ। আসলে অধিকাংশ মানুষজন এটাই বোঝে না, ঐতিহাসিক প্রমাণ কাকে বলে। একটা ছোট উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করবার
চেষ্টা করছি।
বিখ্যাত গোয়েন্দা
চরিত্র সার্লক হোমসকে কে না জানে । এই বিখ্যাত গোয়েন্দার বাড়ি কোথায়? তার বাড়ির ঠিকানা, লন্ডনের
২২১বি ব্যেকার স্ট্রীটে। যে কেউ আজ লন্ডনে গিয়ে ঐ জায়াগার খোঁজ করলে, ঐ স্থানের সন্ধান পাবে। বা কেউ যদি বাড়িতে নিজের বসে গুগোল ম্যাপে
খোঁজে, তবে ম্যাপে এই স্থানের ছবি ভেসে উঠবে। এখন আপনি কী
এ কথা বিশ্বাস করেন যে সার্লক হোমস একজন ঐতিহাসিক ব্যাক্তি? আপনার উত্তর হবে, “না!”। কিন্তু প্রশ্ন হল,
আপনি কী ভাবে প্রমাণ পেলেন যে সার্লক হোমস ঐতিহাসিক ব্যক্তি নন?
আচ্ছা উত্তরটা আমি না হয় দিই!
কোন লেখক যখন কোনও
কাহিনী রচনা করেন, তাঁকে
প্রথমে একটি কাহিনীবিন্যাস বা Plot তৈরি করতে হয়। তার
মধ্যে থাকে কাহিনীর চরিত্ররা এবং নানা ভৌগোলিক স্থানের উল্লেখ। স্যার আর্থার কনান
ড্যয়াল যখন সার্লক হোমস নামের এই কাল্পনিক গোয়েন্দা চরিত্র রচনা করছিলেন, তখন তিনি লন্ডন সহ ইউরোপের নানা দেশের নামও উল্লেখ করেছেন যেখানে রহস্য
সমাধানের জন্য সার্লক হোমসকে যেতে হয়েছিল।
একজন পাঠকের কাছে একটি
কাহিনীকে বাস্তব ঘটনার মতো অনুভব করাতে লেখকেরা এমন কাজটি করে থাকেন। কাহিনী পড়ে
পাঠকের মনে হতে লাগে, সবই
সত্যি বটে! অর্থাৎ, কাহিনীর মূল চরিত্রটি কাল্পনিক হলেও,
যে সকল স্থানের নাম উল্লেখ করা হল, তা
সবই ভৌগোলিক ভাবে বাস্তবে রয়েছে। মানুষ ভৌগোলিক ভাবে সেই সব স্থানে যেতে পারে।
কিন্তু তাতে প্রমাণ হবে না যে, কাহিনীর ঐ মূল চরিত্র একজন
ঐতিহাসিক ব্যাক্তি। একজন ব্যাক্তিকে ঐতিহাসিক চরিত্র হিসেবে তখন মাত্র গ্রহণ করা
যায়, যখন তার সমকালীন অনেক মানুষের লিখিত বর্ণনা বা দলিল
পাওয়া যায়, যারা তাকে চাক্ষুষ দেখেছে।
যে সকল পৌরাণিক কাহিনী
ভারতের মাটিতে রচিত হয়েছে, এবং
সেই রচনায় ভারতের যে সকল স্থানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তা
বাস্তবে থাকতে পারে। কিন্তু তাতে এটা প্রমাণ হয়না, সেই সব
পৌরাণিক কাহিনীর চরিত্রগুলি (রাম, কৃষ্ণ বা রাবণ) বাস্তবে
ছিল। কিন্ত এর পরেও যদি হিন্দুরা ঐ সকল পৌরাণিক চরিত্রগুলিকে বাস্তব বলে মেনে নেয়,
তবে প্রশ্ন ওঠে হিন্দুরা অন্যান্য দেশ ও সম্প্রদায়ের পৌরাণিক
কাহিনীগুলিকে (মিশরীয় পুরাণ, গ্রীক পুরাণ, রোমান পুরাণ, মেসোপটেমীয় পুরাণ) বাস্তব বলে কেন মানে না? তাদের পৌরাণিক
কাহিনীগুলিতে উল্লেখ যে সকল দেবদেবী ও ভগবানের (গিলগামেশ, ওসিরিস, আইসিস, হোরাস, জিউস, হেরা, পসেইডন, অ্যাথেনা, হেডিস) নাম উল্লেখ করা আছে, তাদের পূজা কেন করে না?
তার মানে তো এই দাঁড়ালো, আমার পৌরাণিক
কাহিনী সত্যি, আর বাকিদেরগুলো মিথ্যে!
১৪. হিন্দু সমাজে
ধর্মীয় রাজনীতি ও সামাজিক অবক্ষয়
ভারত যে একটি
ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, এ
কথা ভারতের সংবিধান বলে। তবে সংবিধানে লেখা থাকলেই যে বাস্তবে তেমনটাই হয়ে থাকে,
এমন কোনও কথা নেই। ভারতীয় রাজনীতির বর্তমান রূপটি সেই কথা প্রমাণ
করে দেয়। বিগত কয়েক দশক ধরে, হিন্দুত্ববাদী চিন্তাধারার
যে রাজনীতি করা হচ্ছে, তাতে ভারতকে আর ধর্মনিরপেক্ষ
রাষ্ট্র বলা যাবে না। ভারতে যে সকল হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দলগুলি বা সংগঠনগুলি
রয়েছে, তারা মনে করে, ভারত
শুধুমাত্র হিন্দুদের দেশ। তাই ভারতকে একটি স্বতন্ত্র হিন্দুরাষ্ট্র হিসেবে গড়ে
তোলা দরকার। তবে যারা এই সিধান্ত মেনে নিতে চায়না, তারা
ভারত ছেড়ে অন্য কোনও দেশে চলে যাক। অনেক হিন্দুরাই এই চিন্তাকে সমর্থন করে বলেছেন,
“ভারতে হিন্দুরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ! হিন্দুরা যে ভাবে চাইবে সে ভাবেই
সকলকে চলতে হবে।” তাদের মতে অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলি, বিশেষ করে খ্রীষ্টান, মুসলিম বা বৌদ্ধ
ধর্মাবলম্বীরা ভারতীয় হিন্দু সমাজের শত্রু।
এই ব্যাপারে আমি ভারতীয়
হিন্দুদের এই চিন্তাধারাকে এ প্রকার মেনে নিয়েছি। তবে তাদের কাছে আমি এই আশা করি
যে, যে সকল দেশগুলিতে
হিন্দুরা সংখ্যালঘু অথবা প্রবাসী হয়ে বসবাস করে, সেখানে
সংখ্যাগরিষ্ঠের দিক দিয়ে যে ধর্মের মানুষ আছে, তাদেরও
সিধান্ত ও মতাদর্শ হিন্দুরা বিনা শর্তে মেনে নেবে। এমনকি তখনও, যখন তা হিন্দুদের নিজস্ব ধর্মীয় সিধান্তের বিরুদ্ধে যায়। যেমন বাংলাদেশ
ও পাকিস্থান। এই দুটি দেশে মুসলিমরাই সংখ্যা গরিষ্ঠের দিক দিয়ে বেশী রয়েছে। এখন এই
দুটি দেশ যদি এই সিধান্ত নেয় যে, তারা হিন্দুদের কোনও
প্রকারে ধর্মীয় উপাসনা করতে দেবে না, সেটা কিন্তু
হিন্দুদের মেনে নিতেই হবে। যেহেতু, সেই দেশগুলিতে
মুসলিমরাই সংখ্যাগরিস্থ।
তবে মজার বিষয় হল, হিন্দুদের আমি কিন্তু তখন উল্টো সুরে গান
গাইতে দেখেছি। হিন্দুদের একটা বড় অংশ, ইউরোপের বিভিন্ন
খ্রীষ্টান প্রধান দেশগুলিতে গিয়ে থাকে। তারা সেখানে ভাল চাকরি, ভাল পড়াশুনা, ভাল জীবনযাপনের আশায়, ভারত ছেড়ে চলে গেছে। শুধু তাই নয়, সেখানে গিয়ে
তারা নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী মন্দির তৈরি করেছে। এমনকি হিন্দুধর্মের
প্রচারও করে। এটা অন্যায় কথা নয়। প্রতিটি ব্যাক্তির স্বাধীনতা আছে সে তার নিজের
ধর্ম প্রচার করবে। অথচ, ভারতে যখন একজন খ্রীষ্টান
খ্রীষ্টবিশ্বাস প্রচার করে, প্রভু যীশুর বাণী প্রচার করে,
তখন তাকে বাঁধা দেওয়া হয়, অত্যাচার করা
হয়, তার বিরুদ্ধে ধর্মান্তরকরণের
অভিযোগ এনে তাকে কারাগারে বন্ধী করা হয়। আমার চিন্তা হল, ভারতে
খ্রীষ্টানদের সাথে ঠিক যে ধরণের আচরণ করা হয়, ঠিক তেমনই
আচরণ যদি ইউরোপের খ্রীষ্টান দেশগুলি হিন্দুদের সাথে করা হয়, তখন হিন্দুরা কী করবে?
ভারত যে এখনও বিশ্বের
অন্যান্য দেশের চাইতে বিভিন্ন ব্যাপারে অনেক পিছিয়ে, তার একটা বড় কারণ ধর্মীয় রাজনীতি। ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দলগুলি ভোট ব্যাংক তৈরির জন্য ধর্মীয় অনুভূতি ব্যবহার করে। মূল বিষয়গুলি, যেমনঃ শিক্ষা, কর্মসংস্থান,
নারীর সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্যের মতো রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত বাস্তব ভিত্তিগুলি উপেক্ষা করে আবেগগত,
হিন্দুধর্মীয় পরিচয়-ভিত্তিক
প্রচারণার পক্ষে কাজ করে। একটি সরকার কখনই ধর্মীয়
আবেগের স্বার্থে কাজ করতে পারে না।
সরকারের কাজ, মানুষকে মন্দির মসজিদ বা গির্জা তৈরি করে
দেওয়া নয়। সরকারের মূল কাজ হল মানুষের সকল মৌলিক অধিকার পাইয়ে দেওয়া এবং জাতি ধর্ম
বর্ণ নির্বিশেষে দেশের সকল জনগণের জীবন সুন্দর ও উন্নতমানের করে তোলা। ভারতের
সরকার যখন শুল্ক আদায় করে, তখন তারা কী কেবলমাত্র
হিন্দুদের কাছ থেকেই তা আদায় করে? অন্যান্য ধর্মের
মানুষের কাছ থেকে কী শুল্ক আদায় করে না? তবে দেশের সরকার,
শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষের স্বার্থেই কেন কাজ করবে?
অবশ্য এর জন্য সরকারকে
পুরোপুরি ভাবে দায়ী করা চলে না। ভারতের হিন্দু সমাজ এটাই জানে না, সরকারের কাছ থেকে ঠিক কী কী চাইতে হয়! জনগণ
যেখানে সরকারের কাছ থেকে মন্দির চাইছে, সেই সরকার কেনই বা
জনগণের জন্য অন্য কিছু করবে? সরকার জানে, এদের কে মন্দির বানিয়ে দিলেই খুশি। সেই জায়গায় সরকার অন্য কথা কেন বলবে?
তবে শেষ অবধি হিন্দু জাতির সর্বনাশ হতে চলেছে, এটা নিশ্চিত। আমার এই কথা অনেক হিন্দুরাও সমর্থন করবে।
এই ধর্মীয় রাজনীতির
কারণে, দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক
জীবনের মানকে নেতিবাচক ভাবে প্রভাবিত করেছে তা বিভিন্ন তথ্যে উঠে আসছে। এর ফলে বহু
ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, উদ্যোগপতি ও
আরবপতিরা পাকাপাকি ভাবে ভারতে ছেড়ে ইউরোপ ও আরবের মতো দেশে চলে গেছে। তারা বলেছেন,
ভারতের শুল্কনীতি ব্যাবসা বা উদ্যোক্তাবান্ধব নয়।
তথ্য পরিসংখ্যা বলছে, গত ১০ থেকে ১৪ বছরে ৪৩,৪০০ থেকে ৬১,০০০-এরও বেশি ভারতীয় কোটিপতি (HNWI) দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। ২০২৩ সালেই আনুমানিক ৫,১০০ জন কোটিপতি ভারত ত্যাগ করেছেন উন্নত জীবনযাপন, নিরাপত্তা ও কর-দক্ষতার মতো বিষয়গুলোর কথা
চিন্তা করে। অন্যদিকে ২০২৪
সালে ৪,৩০০ জন এবং ২০২৫ সালে ৩,৫০০
জন দেশ ছাড়বেন বলে অনুমান করেছিল বিশেষজ্ঞ মহল। দেখা
গেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর এবং লন্ডন হলো
ধনী ভারতীয় ও উদ্যোগপতিদের প্রধান গন্তব্যস্থল [৯][১০][১১]।
এই বিষয়টি কী ভারতের
জন্য লজ্জার নয়? একবার ভেবে দেখুন,
যে সমস্ত দেশে ভারতীয় কোটিপতিরা
উন্নতমানের জীবনযাপনের জন্য অভিবাসন করেছে, সেই দেশগুলিকে
ভারতকে ঠিক কোন চোখে দেখছে? আপনি যদি ইউটিউবে খোঁজ করে
দেখেন, দেখবেন, ভারতীয় অনেক
উদ্যোগপতি ও কোটিপতিরা ভারতীয়দের দেশ ত্যাগ অন্য কোনও উন্নতমানের দেশে চলে যাওয়ার
পরামর্শ দিচ্ছে। যাদের কাছে উপায় আছে, তারা সত্যিই দেশ
ছেড়ে চলে যায়। আর যারা পারে না, তারা নিজেদের কপালের দোষ
মনে করে দুঃখ অনুভব করে। সকলেই চায় একটু ভাল জীবনযাপন করতে। দু’বেলা ভাল মতো খেয়ে
পড়ে বাঁচতে। নিজেদের সন্তানদের একটা ভাল ভবিষ্যৎ গড়ে দিতে। কিন্তু এই পোড়া দেশে,
সেটা কল্পনার ব্যাপার! তাই আমি মনে করি, এ দেশের হিন্দুরা এমন ফাঁদে পড়েছে, যা তাদের
নিয়ে ডুববে। তাদের কাছে ধর্মীয় আবেগ থাকবে বটে, কিন্তু
তাদের মাথা তুলে দাঁড়াবার উপায় থাকবে না।
শেষ কথা
অনেক কথাই বললাম। তবে
আমার এই লেখা আর দীর্ঘ করতে চাইনা। যদিও বলার এখনও অনেক কিছুই আছে। তবে যা কিছু
বলেছি, যথেষ্ট বলেছি। তাতে আশা
করি পাঠকের কাছে এটা অন্তত স্পষ্ট হয়েছে যে, কেন আমি
হিন্দুধর্ম ত্যাগ করেছি। হিন্দুধর্ম আমাকে যে পরিমাণ সামাজিক ও মানসিক যন্ত্রণা
দিয়েছে, হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে আমি সেই যন্ত্রণা থেকে
চিরমুক্তি পেয়েছি। এটা আমার জীবনের সেরা সিধান্ত। আমি এর জন্য কোনদিনও অনুশোচনা
করবো না। দুঃখও করবো না।
হ্যাঁ, এর জন্য অনেকের কাছে আমি অপরাধী, অনেকের কাছে আমি আবার পাপী, আবার অনেকের কাছে আমি একজন বিচক্ষণ ব্যক্তি। কিন্তু আমার কাছে আমি একজন সত্যসন্ধানী শান্তি প্রিয় মানুষ। এই যাত্রায় আমি একা নই। আমারই মতো অগণিত মানুষ রয়েছেন আমার আশেপাশে। তাদেরও কাহিনী আছে। আমার ব্যাক্তিগত মত এই যে, হিন্দুধর্ম সত্য নয়! এর সিধান্তগুলিও সঠিক নয়! এর মধ্যেকার আধ্যাত্মিকতাও সমাজ জীবনের সাথে বেমানান। এ কথা আমি খামখেয়ালী মনের ইচ্ছায় বলছি না, বলছি ব্যাক্তগত অভিজ্ঞতা, পড়াশুনা, হিন্দু সমাজের বাস্তব চিত্র ও নানা রকমের ব্যাক্তিগত গবেষণার মাধ্যমে। আগামী দিনগুলিতে আরও অনেক কিছু প্রকাশ পাবে। যা আমার বক্তব্যকে সত্য প্রমাণ করবে। আজ আমি বলছি, কাল অন্য কেউ বলবে। সুতরাং, এখানেই ইতি টানছি।
তথ্যসূত্রঃ
https://www.pewresearch.org/religion/2016/12/13/hindu-educational-attainment/
২. https://www.education.gov.in/sites/upload_files/mhrd/files/parliament_annexure_en/2258_eng.pdf
৩. https://www.thehindu.com/opinion/op-ed/language-discrimination/article27526829.ece
৬. Kaur, Banjot (2022-09-06). "Foeticide: More 'Missing' Girls Among Hindus
Than Muslims in Last Two Decades, Official Data Shows". The Wire. Retrieved 2022-09-06.
৮. https://www.bbc.com/news/world-asia-india-49109767
